আমানতকারীদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়ে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, 'কোনো হেয়ারকাট (আমানতের অর্থের একটি অংশ কেটে রাখার) হবে না। আমানতকারীরা তাদের টাকা ও সুদ- দু’টিই ফেরত পাবেন। আমি এ বিষয়ে আপনাদের নিশ্চয়তা দিচ্ছি।'
বুধবার জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালি বিধির ৭১ বিধিতে সরকারি দলের সংরক্ষিত নারী আসন-৪ এর সদস্য রেহানা আক্তার রানুর উত্থাপিত জরুরি জন-গুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণ নোটিশের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, 'দেশের সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর আমানতকারীরা তাদের আমানতের অর্থ সুদসহ ফেরত পাবেন। ব্যাংকগুলো ক্রমবর্ধমান লোকসানে থাকায় এ প্রক্রিয়ায় কিছুটা সময় লাগবে। তাৎক্ষণিক ভাবে সব অর্থ পরিশোধ করা সম্ভব নয়।'
তিনি বলেন, 'আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং ব্যাংকিং খাতের অনিয়মের মাধ্যমে পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারে সরকার ইতোমধ্যে একটি সমন্বিত আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তুলেছে।'
তিনি আরও বলেন, 'আরেকটু ধৈর্য ধরুন। এসব ব্যাংকই লোকসানে চলছে এবং প্রতিদিন লোকসান বাড়ছে। একটি ব্যাংক যখন আমানতের টাকাই ফেরত দিতে পারে না, তখন সেই ব্যাংকের জন্য সুদ পরিশোধ কতটা কঠিন, তা সহজেই বোঝা যায়।'
তবে তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন, 'নির্বাচিত সরকার হিসেবে জনগণের স্বার্থ রক্ষা করা সরকারের দায়িত্ব।'
মন্ত্রী বলেন, 'আমরা অবশ্যই নিশ্চিত করব, আমানতকারীরা তাদের মূল অর্থ ও সুদ- উভয়ই পাবেন। তবে এর জন্য কিছুটা সময় প্রয়োজন।'
ব্যাংকিং সংকটে মানুষের দুর্ভোগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'অনেক আমানতকারী চরম আর্থিক সংকটে রয়েছেন। আমি জানি মানুষের অপেক্ষা করার সময় নেই। কেউ চিকিৎসার অভাবে মারা যাচ্ছেন, কেউ মেয়ের বিয়ে দিতে পারছেন না। প্রতিদিনই আমি এসব সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছি।'
তিনি আরও বলেন, 'এ সংকট নিরসনে মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ প্রয়োজন। তবে আমানতকারীদের অর্থ নিরাপদ রয়েছে।'
অর্থমন্ত্রী বলেন, 'আমি নিশ্চিত ভাবে বলতে পারি, আমানতকারীরা তাদের টাকা ফেরত পাবেন। সুদও পাবেন। এটি নিশ্চিত। তবে সবাইকে একটু ধৈর্য ধরতে হবে।'
তিনি বলেন, 'আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সরকার ব্যাংক রেজ্যুলেশন আইন, ২০২৬ প্রণয়ন করেছে। এর মাধ্যমে একটি সুসংগঠিত ও বহুমাত্রিক ব্যাংক পুনর্গঠন কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে।'
তিনি আরও বলেন, 'নতুন আইনের আওতায় আর্থিক ভাবে দুর্বল পাঁচটি ব্যাংক- এক্সপোর্ট ইমপোর্ট ব্যাংক অব বাংলাদেশ (এক্সিম ব্যাংক) পিএলসি, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক পিএলসি, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসি, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসি এবং ইউনিয়ন ব্যাংক পিএলসি- একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি গঠন করা হয়েছে।'
এটিকে দেশের ব্যাংক পুনর্গঠন কৌশলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন আমির খসরু।
তিনি বলেন, 'নবগঠিত ব্যাংকে একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংকের সব আমানতকারীর দাবি ও স্বার্থ সম্পূর্ণ ভাবে সুরক্ষিত রাখা হয়েছে।'
তিনি আরও বলেন, 'আমানত সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর মাধ্যমে আমানতকারীদের আইনি সুরক্ষা জোরদার করা হয়েছে। এতে সর্বোচ্চ বীমাকৃত আমানতের সীমা ১ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ টাকা করা হয়েছে। এছাড়া আগে আমানত সুরক্ষার আওতার বাইরে থাকা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আমানতকারীদেরও এ আইনের আওতায় আনা হয়েছে।'
অর্থমন্ত্রী বলেন, 'রেজ্যুলেশনের আওতাভুক্ত ব্যাংকগুলোর আমানতকারীরা ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক চালু করা বিশেষ ব্যবস্থার মাধ্যমে ধাপে ধাপে তাদের অর্থ ফেরত পাচ্ছেন।'
তিনি বলেন, 'পাঁচটি ব্যাংকে ঋণ অনিয়ম ও আর্থিক দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে বিশেষ ফরেনসিক নিরীক্ষা চলছে। নিরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে আত্মসাৎ করা সম্পদ উদ্ধার এবং আমানতকারীদের অর্থ ফেরত নিশ্চিত করতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'
ব্যাংক রেজ্যুলেশন আইন, ২০২৬-এর ৫৭ ধারার উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'ব্যাংকিং অনিয়মের মাধ্যমে অর্জিত আয়, সম্পদ, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ও অধিকার নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ক্ষমতা বাংলাদেশ ব্যাংককে দেওয়া হয়েছে।'
আমির খসরু বলেন, 'এই আইনের প্রয়োগের মাধ্যমে দায়ী ব্যক্তিদের সম্পদ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে সেগুলো বিক্রি বা নিলামের মাধ্যমে আমানতকারীদের অর্থ উদ্ধার করা সম্ভব হবে।'
তিনি বলেন, 'ফৌজদারি মামলার পাশাপাশি খেলাপি ঋণ আদায় এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্নীতির মাধ্যমে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে সরকার দেওয়ানি কার্যক্রমও শুরু করেছে।'
তিনি আরও বলেন, 'প্রায় ৩০টি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংক গোপনীয়তা চুক্তি (এনডিএ) স্বাক্ষরের পর ‘নো উইন, নো ফি’ ভিত্তিতে নয়টি আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠান নিয়োগের কাজ শুরু করেছে, যারা বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ ও খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারে কাজ করবে।'
মন্ত্রী বলেন, 'প্রথম ধাপে এস আলম গ্রুপ, সাইফুজ্জামান চৌধুরী, বেক্সিমকো গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ, নাসা গ্রুপ ও ওরিয়েন্ট গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট ছয়টি অগ্রাধিকার মামলায় দেওয়ানি কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এ কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণ করা হবে।'
তিনি বলেন, 'আগের সরকারের আমলে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে। বর্তমান সরকার সেই সম্পদ দেশে ফিরিয়ে আনা এবং দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সম্ভাব্য সব আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।'
আরো পড়ুন: