বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত নয়টি ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় এক লাখ ৮৮ হাজার ৭০১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা দাঁড়িয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
রোববার জাতীয় সংসদে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য সাবিকুন্নাহারের করা প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য জানান।
অর্থমন্ত্রী বলেন, 'গত ৩১ মে পর্যন্ত সিআইবি ডাটাবেইজে অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি, জনতা ব্যাংক পিএলসি, রূপালী ব্যাংক পিএলসি, সোনালী ব্যাংক পিএলসি, বেসিক ব্যাংক পিএলসি, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক পিএলসি, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক ও প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের প্রেরিত তথ্যের ভিত্তিতে এই হিসাব নিশ্চিত করা হয়েছে।'
সংসদে উত্থাপিত তথ্যে তিনি বলেন, 'ব্যাংকিংখাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে বিদ্যমান খেলাপি ঋণের উচ্চ হার কমিয়ে আনার আবশ্যকতা রয়েছে, যা বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারেও অন্যতম বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এই লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ব্যাংকিংখাতের শ্রেণীকৃত ঋণের হার কমিয়ে আনার নিমিত্ত ব্যাংকসমূহের জন্য শ্রেণীকৃত ঋণ রেজল্যুশন স্ট্র্যাটেজি সংক্রান্ত গাইডলাইন প্রণয়ন এবং আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার সাথে সামঞ্জস্য রেখে বিদ্যমান ক্রেডিট রিস্ক ম্যানেজমেন্ট গাইডলাইন হালনাগাদ করা হচ্ছে।'
তিনি আরও বলেন, 'মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় বার্ষিক আর্থিক বিবরণীর স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধিতে ব্যাংকিং খাতে ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং স্ট্যান্ডার্ড-৯ বাস্তবায়ন, বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহের নিজস্ব মূল্যায়নের পাশাপাশি তালিকাভুক্ত জামানত মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঋণের বিপরীতে প্রদত্ত জামানত মূল্যায়ন করার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। একইসঙ্গে স্বল্পমেয়াদি কৃষি ঋণের পুনঃতফসিলিকরণ নীতিমালা পর্যালোচনাপূর্বক হালনাগাদকরণ, শ্রেণিকৃত ঋণ আদায়ের জন্য কর্মকর্তাদের উৎসাহিত করতে বিশেষ ভাতা প্রদান সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়ন এবং দেশে উন্নত ঋণ সংস্কৃতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারী ভালো ঋণগ্রহীতাদের প্রণোদনা প্রদান সংক্রান্ত বিদ্যমান নীতিমালা হালনাগাদ করার প্রক্রিয়া চলছে।'
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বিষয়ে আমির খসরু বলেন, 'একজন ঋণগ্রহীতা কর্তৃক সমগ্র ব্যাংকিংখাত হতে ঋণ গ্রহণের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ এবং ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের জন্য গৃহীতব্য ব্যবস্থাসমূহ কিছু কিছু অন্যান্য খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের জন্যেও আরোপের বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অর্থ ঋণ আদালতের বিচারক প্যানেল বা জুরি বোর্ডে অভিজ্ঞ ব্যাংকার অন্তর্ভুক্তকরণ, খেলাপি ঋণগ্রহীতাগণ যাতে রিট করে ঋণ আদায় কার্যক্রম স্থবির করতে না পারে সে লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বেসরকারিখাতে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়নের কাজ চলছে।'
তিনি বলেন, 'ব্যাংকসমূহের মূলধন ঘাটতি, তারল্য সংকট, দেউলিয়াত্ব বা ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকের কার্যকর ও সময়োপযোগী সমাধানের কাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যে 'ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬' প্রণয়ন করা হয়েছে এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি জনআস্থা সুদৃঢ় করতে 'আমানত সুরক্ষা আইন, ২০২৬' প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর শীর্ষ পদে দক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের সংশোধনী আইন ২০২৬ প্রণয়ন করা হয়েছে। যার পাশাপাশি নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্ট আইন সংশোধনের মাধ্যমে চেক জালিয়াতি ও চেক ডিসঅনার মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া সহজ ও কার্যকর করা হয়েছে। সামগ্রিক ভাবে একটি সুস্পষ্ট আইনি কাঠামো, স্বচ্ছ রেজল্যুশন প্রক্রিয়া এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার নিশ্চয়তা এই তিনটি উপাদান একত্রে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কার্যকর ভূমিকা রাখছে।'
আরো পড়ুন: