বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়েছে আদানি

বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়েছে আদানি

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৬ নভেম্বর, ২০২৫ ২১:৩১

আপডেট: ১৬ নভেম্বর, ২০২৫ ২১:৩৫

বকেয়া জটিলতার মধ্যেই ভারতের আদানি পাওয়ার হঠাৎই বাংলাদেশে ৬৬ শতাংশ পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়েছে। তবে শীত শুরু হওয়ার কারণে দেশে বিদ্যুৎ চাহিদা কম থাকায় এর তেমন প্রভাব দেখা না গেলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে এক ধরনের উত্তেজনা দেখা গেছে। 

আদানি বলছে, দুই ইউনিটের বিদ্যুৎকেন্দ্রটির একটি ইউনিট কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে গেছে। 

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) কর্মকর্তারা বলছেন, আদানি পাওয়ার কারিগরি ত্রুটির কথা বলে একটি ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ রেখেছে।

বিদ্যুতের সরবরাহ ঠিক রাখতে গ্যাস ও কয়লা থেকে উৎপাদন বাড়ানো হয়েছে। সম্প্রতি যথাসময়ে বকেয়া না পেলে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধের হুমকি দিয়েছিল ভারতের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটি।

বিপিডিবি চেয়ারম্যানকে পাঠানো এক চিঠিতে আদানি জানিয়েছিল, গত ১০ নভেম্বরে মধ্যে বকেয়া পরিশোধ না করলে ১১ নভেম্বর থেকে তারা বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেবে। পরবর্তী সময়ে সরবরাহ বন্ধের সম্ভাবনা এড়াতে চলতি মাসের মধ্যে মোট বকেয়ার আংশিক ১০০ মিলিয়ন ডলার পরিশোধের বিষয়ে আদানিকে জানায় বিপিডিবি।

ওই দিন রাতেই আদানি পাওয়ার থেকে পাঠানো এক বার্তায় আদানি পাওয়ার জানায়, বিপিডিবির কাছে বকেয়া বেড়ে যাওয়ার কারণে কোম্পানিটি বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যাহত রাখতে বাড়তি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। কম্পানির দাবি, স্বীকৃত ও বিরোধহীন বকেয়ার পরিমাণ বিলম্বিত সুদসহ প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। দীর্ঘদিন ধরে পাওনা পরিশোধ না হওয়ায় তাদের স্টেকহোল্ডাররাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, যা বিদ্যুৎকেন্দ্রের কার্যক্রম পরিচালনাকে ক্রমেই কঠিন করে তুলছে।

বিপিডিবি সূত্রে জানা গেছে, ভারতের ঝাড়খণ্ড রাজ্যে নির্মিত আদানির কয়লাভিত্তিক দুই ইউনিটের বিদ্যুৎকেন্দ্রটি এক হাজার ৬০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার।

চুক্তি অনুযায়ী, এই কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ২৫ বছর ধরে কিনবে বাংলাদেশ। বর্তমানে দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ১০ শতাংশের মতো আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রটি থেকে আসে। এরই মধ্যে দফায় দফায় অর্থ পরিশোধ বিলম্বিত হওয়ায় সম্পর্কের টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে। এসব কারণে আগেও বেশ কয়েকবার বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছিল আদানি।

এদিকে আদানি পাওয়ার সূত্রে জানা গেছে, আদানি পাওয়ারের দুই ইউনিটের একটিতে গত বৃহস্পতিবার হঠাৎ প্রযুক্তিগত ত্রুটি দেখা দেওয়ায় বন্ধ রাখা হয়েছে। বিষয়টি বিপিডিবিকে জানানো হয়েছে। একইসঙ্গে ইউনিটটি দ্রুত পুনরায় চালু করতে সক্রিয় ভাবে কাজ করা হচ্ছে।

বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের একমাত্র রাষ্ট্রীয় সংস্থা পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি। প্রতিষ্ঠানটির শনিবারের তথ্য বলছে, বিকেল ৪টার দিকে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ৯ হাজার ২৭০ মেগাওয়াট। এ সময় চাহিদার পুরোটাই সরবরাহ করা হয়েছে। 

সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বাড়ানোর কারণে কোনো লোডশেডিং ছিল না। এই সময়ে আদানির কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয় ৫১৫ মেগাওয়াট। স্বাভাবিক সময়ে আদানির কেন্দ্রটি থেকে বিদ্যুৎ পাওয়া যেত সাড়ে ১৪০০ মেগাওয়াটের মতো। সর্বশেষ গত ০৫ নভেম্বর রাত ৯টায় এক হাজার ৪৪৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যায়। এরপর থেকে গত ১২ নভেম্বর পর্যন্ত এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ মেগাওয়াটের মতো বিদ্যুৎ সরবরাহ করে আসছিল আদানি পাওয়ার। গত বৃহস্পতিবার আদানির একটি ইউনিট থেকে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ওই দিন সকাল ৮টায় ৫০০ মেগাওয়াটে নেমে আসে।

বিপিডিবির কর্মকর্তারা বলেন, বর্তমানে বিদ্যুতের চাহিদা দিনের বেলা ১০ হাজার মেগাওয়াটের নিচে নেমেছে। এই কারণে আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ কমার তেমন প্রভাব পড়েনি। সাধারণত গ্রীষ্মে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে ১৭ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত ওঠে। তাই এখন আদানির বিদ্যুৎ তেমন প্রয়োজন মনে না হলেও তখন খুবই প্রয়োজন হয়। কারণ তখন সামাল দিতে গ্যাস, কয়লার পাশাপাশি ব্যয়বহুল তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো চালাতে হয়।

বিপিডিবি সূত্র বলছে, আদানির সঙ্গে তাদের বিদ্যুৎ কেনার চুক্তির প্রক্রিয়া তদন্ত করা হচ্ছে। এরই মধ্যে এতে অনিয়ম খুঁজে পেয়েছে চুক্তি পর্যালোচনা কমিটি। প্রমাণ সংগ্রহে আরও মাসখানেক সময় লাগবে। 

সূত্র মতে, গত সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে একতরফা চুক্তির সুযোগ নিয়েছে আদানি। এ চুক্তির বৈধতা নিয়ে উচ্চ আদালতে একটি রিট মামলা বিচারাধীন। আদালতের আদেশে তদন্ত চলছে। এতে আদানিকে দেশি-বিদেশি আদালতে জবাবদিহি করার মতো তথ্য-প্রমাণ আসছে। এসব প্রমাণ আদালতে জমা দেওয়া হবে। এ কারণে মধ্যস্থতার জন্য বিশেষজ্ঞ নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত রাখতে অনুরোধ করে সিঙ্গাপুর ইন্টারন্যাশনাল আরবিট্রেশন সেন্টারের রেজিস্ট্রারের কাছে গত ০২ নভেম্বর একটি চিঠি পাঠিয়েছে বিপিডিবি।

চিঠিতে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিতে অনিয়মের অভিযোগ তদন্তের জন্য উচ্চ আদালতের নির্দেশে কমিটি গঠিত হয়েছে। এসব অভিযোগ আদানির আবেদনের সঙ্গে সম্পর্কিত। গত ০৫ অক্টোবর চিঠি দিয়ে এটি আদানিকে জানানো হয়েছে এবং তদন্তের জন্য বাড়তি সময় চাওয়া হয়েছে।