নাটোর বিসিক: বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকটে বন্ধ ৩ কারখানা

নাটোর বিসিক: বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকটে বন্ধ ৩ কারখানা

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১০ ডিসেম্বর, ২০২৫ ২০:৪৪

৩৮ বছর পেরিয়ে গেছে নাটোরের বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশনের (বিসিক)। এখনও নানা সংকট ও অব্যবস্থাপনার রয়ে গেছে এখানে।

চুক্তি অনুযায়ী, সার্ভিস চার্জ না কমানো, ভাঙা সড়ক, পানি-গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি, ড্রেনেজ সমস্যাসহ মৌলিক সুবিধার অভাবে শিল্প কারখানার কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।

এদিকে, শিল্পনগরীর সম্প্রসারণ থেমে থাকায় জেলায় নতুন শিল্প স্থাপন ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। 

উদ্যোক্তারা মনে করেন, সড়ক উন্নয়ন ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ঠিক হলে পরিস্থিতি অনেক বদলে যেত। স্থানীয় সহযোগিতা না মেলায় সেই উদ্যোগও এগোচ্ছে না বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। সব মিলিয়ে কম মজুরি, অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার চাপে বন্ধ হওয়ার পথে কিছু কারখানাও; যা শিল্পায়নের অগ্রযাত্রাকে আরও শঙ্কায় ফেলছে।

১৯৮৭ সালে নাটোর পৌরসভার দত্তপাড়া এলাকায় ১৫ একর জমিতে প্রতিষ্ঠিত হয় নাটোর বিসিক। ২০০০ সালের মধ্যে ১০৫টি প্লট ও ৩৮টি শিল্প ইউনিট গড়ে ওঠে। এর মধ্যে রসায়নজাত ১৭টি, বস্ত্র ও পাটজাত ১১টি, খাদ্যজাত ৫টি, প্রকৌশল ৪টি এবং ১টি ইউনিট হস্তান্তর প্রক্রিয়াধীন। 

২০২৩ সালে বিসিক প্রণীত বিধিমালায় রয়েছে, প্লট কিস্তি সুবিধা ছয় বছরে ১২ কিস্তি পরিশোধ। নারী উদ্যোক্তা হলে ৭ বছরে ১৪ কিস্তি। রাস্তা, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, কালভার্ট নির্মাণ; বিসিক প্লটের নকশা অনুমোদন; শিল্প নিবন্ধন; সহজে ইমপোর্ট রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট প্রদান; শিল্প রেটে বিদ্যুৎ সরবরাহ; ক্রেতা-বিক্রেতা সম্মেলন; পরিবেশ সুরক্ষায় গ্রিন স্পেস রাখা; শিল্প স্থাপনে জেলা কার্যালয় থেকে এনওসি প্রদান; শিল্পনগরীর নিজস্ব তহবিল থেকে প্রণোদনাস্বরূপ উদ্যোক্তাদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। 

এসব বিধির বেশির ভাগই মানা হচ্ছে না। ২০১১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নাটোরে গ্যাস সরবরাহ ও বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ঘোষণা দেন। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালু হলেও জেলার পাশ দিয়ে গ্যাস পাইপলাইন গেলেও নাটোরে সংযোগ দেওয়া হয়নি। নানা সমস্যায় এরই মধ্যে তিনটি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।

কথা ছিল ১৫ বছরের মধ্যে সার্ভিস চার্জ বাড়ানো হবে না। কিন্তু হঠাৎ করেই সার্ভিস চার্জ ১৫ পয়সা থেকে ৩ টাকা করা হয়েছে। আবার গ্যাস দেওয়ার প্রতিশ্রুতি থাকলেও এখনও দেওয়া হয়নি। প্লট না থাকায় নতুন শিল্প স্থাপনও সম্ভব হচ্ছে না- এমনই অভিযোগ ব্যবসায়ীদের। 

নাটোর জুট মিলসের স্বত্বাধিকারী শ্যামসুন্দর আগরওয়ালার মতে, যদি গ্যাস সংযোগ বা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা যায় এবং বিসিকের জায়গা বাড়ানো হয়, তাহলে নাটোরে বিপুল সংখ্যক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং জাতীয় অর্থনীতিতেও বড় ভূমিকা রাখা সম্ভব।

আমানা এগ্রোর এমডি আব্দুস সাত্তার বলেন, ‘বর্ষায় পানি ঢুকে প্রায় তিন লাখ টাকার পণ্য নষ্ট হয়েছে। সড়কও ভাঙাচোরা। লিখিত অভিযোগ করলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।’

বিসিক ব্যবসায়ী সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আবদার রহমান বলেন, ‘বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়মিত নয়। প্রথমে ৬০০ কিলোওয়াট দেওয়ার ছিল, তা দেওয়া হচ্ছে না। গ্যাস না থাকায় উৎপাদন খরচ কেজিতে ১০-১২ টাকা বেশি পড়ে। লোকসানে পড়ে গত তিন বছরে চারটি মেটাল কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।’

শ্রমিক সর্দার মিঠুর দাবি, বিসিকে ২,৫০০-৩,০০০ শ্রমিক কাজ করেন। পুরুষ শ্রমিকরা আট ঘণ্টায় ৫০০-৭০০ টাকা পেলেও নারী শ্রমিকরা পান মাত্র ২২০-২৫০ টাকা। ওভারটাইমে ২০০ টাকা বাড়ে। বাজার দরের তুলনায় এটি খুব কম।’

বিসিকের উপব্যবস্থাপক মেহেদী হাসান বলেন, ‘নাটোর বিসিক ‘বি’ গ্রেডের হওয়ায় এখানকার সার্ভিস চার্জ অন্যান্য জায়গার তুলনায় কম। পানি নিষ্কাশন ও সড়ক সংস্কারের বাজেট এসেছে। খুব শিগগির কাজ হবে। শ্রমিকদের মজুরি দক্ষতার ওপর নির্ভর করে মাসিক মিটিংয়ে তা পর্যালোচনা করা হয়।’

জেলা প্রশাসক ও বিসিক সভাপতি আসমা শাহীন বলেন, ‘২০০৮ সালে বিসিকের জায়গা সম্প্রসারণের আবেদন পাঠানো হলেও সিদ্ধান্ত হয়নি। আশপাশে খালি জমি না থাকায় সম্প্রসারণ আটকে আছে। জমি পাওয়া গেলে অধিগ্রহণ করে বিসিকের আয়তন বাড়ানো হবে।’