ভোলার শাহবাজপুর গ্যাস ক্ষেত্র থেকে প্রাপ্ত উদ্বৃত্ত ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস এলএনজি আকারে ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় আনার উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। কিন্তু এই এলএনজি পরিবহনে যে পরিমাণ ব্যয় হবে, তার চেয়ে ভোলায় ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করলে রাষ্ট্র সেই অর্থ সাশ্রয় করতে পারবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)।
মঙ্গলবার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) ভোলার প্রস্তাবিত এলএনজির দাম নির্ধারণের বিষয়ে গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়। বিপিডিবির অতিরিক্ত পরিচালক (অর্থ পরিদপ্তর) সৈয়দ জুলফিকার আলী সেখানে ভোলায় ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাব তুলে ধরেন।
ভোলা থেকে ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস এলএনজিতে রূপান্তরের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। বিপিডিবির হিসাব অনুযায়ী, এ পরিমাণ গ্যাস পরিবহনে বছরে খরচ হবে ৯৩০ কোটি টাকা। ১০ বছর ধরে পরিবহন করলে খরচ দাঁড়াবে ৯ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। বিপিডিবি মনে করে, বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে এই ব্যয় এড়ানো সম্ভব।
জুলফিকার আলী বলেন, ‘এক ঘনমিটার গ্যাস দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ হবে ইউনিটপ্রতি ৪-৫ টাকা। ঢাকায় সঞ্চালনের খরচ ইউনিটপ্রতি মাত্র ১ টাকা ২৪ পয়সা। এভাবে ভোলায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের মোট খরচ হবে গড়ে সর্বোচ্চ ৬ টাকা ২৪ পয়সা। বিপরীতে ভোলা থেকে এলএনজি আকারে গ্যাস আনার খরচ প্রতি ঘনমিটারে ২৯ টাকা ৯০ পয়সা। ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি পরিবহন করতে বছরে ৯৩০ কোটি টাকা লাগবে। ১০ বছরের চুক্তিতে ব্যয় দাঁড়াবে ৯ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করলে রাষ্ট্রীয় অর্থ সাশ্রয় সম্ভব।’
গণশুনানিতে আরও বলা হয়, রাজধানী ও আশপাশের এলাকার গ্যাস সংকট এখন প্রকট। ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত করতে দৈনিক ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। ঢাকা ও আশপাশের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে এ গ্যাস সমন্বয় করলে রাজধানীর গ্যাস সংকট কিছুটা কমবে এবং বিদ্যুতের ঘাটতি দূর হবে।
বর্তমানে ভোলা থেকে সিএনজি আকারে গ্যাস পরিবহন খরচ ধরা হয়েছে প্রতি ঘনমিটার ২৯ টাকা ৯০ পয়সা। ভোক্তা পর্যায়ে বিক্রি হচ্ছে প্রতি ঘনমিটার ৪৭ টাকা ৫০ পয়সায়। বিইআরসি টেকনিক্যাল কমিটি (টিইসি) জানিয়েছে, এলএনজি পরিবহন নতুন প্রযুক্তি হওয়ায় সুনির্দিষ্ট খরচ নির্ধারণ করা কঠিন। তাই ২৯ টাকা ৯০ পয়সা ঊর্ধ্বসীমা প্রস্তাব করা হয়েছে। দরপত্র আহ্বান, লাইসেন্স অনুমোদন ও গণশুনানির মাধ্যমে চূড়ান্ত দর নির্ধারণের সুপারিশ করেছে কমিটি।
গণশুনানি শেষে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, ‘সব মতামত নেওয়া হয়েছে। ০২ ফেব্রুয়ারির মধ্যে লিখিত মতামত দেওয়া যাবে। যাচাই-বাছাই শেষে সিদ্ধান্ত নেব। পাইপলাইনের প্রয়োজন থাকবে। ভোলা-বরিশাল পাইপলাইনের প্রাক-সমীক্ষা শেষ হয়েছে। সময়ের গুরুত্ব বিবেচনায় আগে এটি বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।’
তবে গণশুনানিতে বক্তারা ভোলা থেকে এলএনজি আকারে গ্যাস আনার তীব্র বিরোধিতা করেন। তারা বলেন, এ পদ্ধতি ব্যয়বহুল এবং নতুন প্রযুক্তি। ভোলার গ্যাস সাশ্রয়ী মূল্যে বিতরণ করার পরিকল্পনা প্রয়োজন। তারা উল্লেখ করেন, পূর্বের সরকারের সময়ে একটি বিশেষ কোম্পানিকে সুবিধা দিতে এলএনজি আনা অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। এখন সেই ব্যয় পুনঃমূল্যায়ন করা জরুরি।
দেশে গ্যাস সংকট গুরুতর। ভোলায় দৈনিক গ্যাস উত্তোলন হচ্ছে মাত্র ৭০ মিলিয়ন ঘনফুট। তিনটি ফিল্ডে নয়টি কূপের উৎপাদন সক্ষমতা দৈনিক ১৯০ মিলিয়ন ঘনফুট। পাইপলাইন না থাকায় জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে না। পেট্রোবাংলা ভোলায় ১৫টি কূপ খননের উদ্যোগ নিয়েছে। পাইপলাইন ও নতুন কূপ খনন শেষে দৈনিক ৩০০-৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন সম্ভব বলে আশা করছে বাপেক্স।
ভোলা-বরিশাল-ঢাকা পাইপলাইন প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই চললেও অর্থায়ন সংকটের কারণে প্রকল্প বাস্তবায়ন আটকে আছে। গণশুনানিতে পেট্রোবাংলা, তিতাস গ্যাস, সুন্দরবন গ্যাস, বাপেক্স, জিটিসিএল, আরপিজিসিএলসহ বিভিন্ন সংস্থা ও ব্যবসায়ী সংগঠন অংশ নেন।
অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভায় নদীপথে ভোলার গ্যাস এলএনজিতে পরিবহনের বিষয়ও আলোচ্য সূচিতে ছিল। সরকার ভোলার গ্যাস নদীপথে এলএনজি আকারে পরিবহন করে তিতাস অধিভুক্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সরবরাহের পরিকল্পনা করেছিল। তবে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অনুরোধে আলোচনা থেকে এটি প্রত্যাহার করা হয়।
Tag:
আরো পড়ুন: