দীর্ঘ এক মাসের পরিকল্পিত রক্ষণাবেক্ষণ শেষে পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলায় অবস্থিত পায়রা ১৩২০ মেগাওয়াট তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে আবারও বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়েছে। শুক্রবার বিকেল থেকে ৬৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন এই ইউনিটটি জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে, ফলে দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় তাৎক্ষণিক স্বস্তি ফিরেছে।
পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জানুয়ারির শুরুতে নির্ধারিত রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমের জন্য প্রথম ইউনিটটি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছিল। বর্তমানে কেন্দ্রটির দুটি ইউনিটই পূর্ণ সক্ষমতায় চালু রয়েছে এবং সম্মিলিতভাবে ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করছে।
বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, পায়রার প্রথম ইউনিট পুনরায় চালু হওয়ায় সাম্প্রতিক লোড ব্যবস্থাপনা আরও সহজ হবে, বিশেষ করে শীত শেষে গ্রীষ্মমুখী সময়ে চাহিদা বাড়তে শুরু করলে। জাতীয় গ্রিডে বড় একটি বেসলোড কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় যুক্ত হওয়াকে তারা স্বল্পমেয়াদে ইতিবাচক উন্নয়ন হিসেবে দেখছেন।
বিদ্যুৎ সরবরাহে তাৎক্ষণিক প্রভাব
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় পায়রা তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র একটি গুরুত্বপূর্ণ বেসলোড উৎস। এলএনজি ও তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর তুলনায় এর উৎপাদন খরচ তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল হওয়ায়, বড় ইউনিট বন্ধ থাকলে সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়। জানুয়ারি মাসে প্রথম ইউনিট বন্ধ থাকায় বিকল্প উৎস থেকে বিদ্যুৎ নিতে হয়েছে, যা জ্বালানি ব্যয় বাড়িয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা স্বীকার করছেন।
এখন দুই ইউনিটই সচল থাকায় গ্রিডের ফ্রিকোয়েন্সি ও ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে এবং ব্যয়বহুল তরল জ্বালানিনির্ভর কেন্দ্রগুলোর ওপর নির্ভরতা সাময়িকভাবে কমতে পারে।
কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ নিয়ে নীতিগত বিতর্ক
তবে পায়রার উৎপাদন স্বাভাবিক হওয়া বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘমেয়াদি দিকনির্দেশনা নিয়ে নতুন প্রশ্নও সামনে আনছে। বাংলাদেশ সরকার একদিকে কয়লাভিত্তিক প্রকল্প থেকে ধীরে ধীরে সরে আসার কথা বলছে, অন্যদিকে পায়রার মতো বৃহৎ কেন্দ্রগুলো এখনো জাতীয় গ্রিডের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।
জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তবতায় বাংলাদেশ এখনো পুরোপুরি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর নির্ভর করার অবস্থায় নেই। “পায়রার মতো কেন্দ্রগুলো স্বল্প ও মধ্যমেয়াদে বিদ্যুৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে,” বলেন এক জ্বালানি অর্থনীতিবিদ। তবে তিনি যোগ করেন, “দীর্ঘমেয়াদে কয়লা নির্ভরতা কমাতে হলে রক্ষণাবেক্ষণ, জ্বালানি আমদানি ও পরিবেশগত ব্যয়ের বিষয়গুলো আরও স্বচ্ছভাবে বিবেচনা করতে হবে।”
পরিবেশ ও ব্যয়ের প্রশ্ন
পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিবেশগত প্রভাব নিয়েও আলোচনায় থাকে। কয়লা আমদানি, ছাই ব্যবস্থাপনা এবং উপকূলীয় পরিবেশে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগ রয়েছে। কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ বলছে, নির্ধারিত পরিবেশগত মান বজায় রেখেই উৎপাদন পরিচালিত হচ্ছে, তবে পরিবেশবাদীরা আরও শক্ত নজরদারির দাবি জানাচ্ছেন।
সামনে কী
বিদ্যুৎ বিভাগ আশা করছে, পায়রার দুই ইউনিট স্থিতিশীলভাবে চালু থাকলে আসন্ন গরম মৌসুমে লোডশেডিংয়ের ঝুঁকি সীমিত রাখা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—কীভাবে এই ধরনের বড় কয়লাভিত্তিক প্রকল্পকে বিদ্যমান ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধীরে ধীরে নবায়নযোগ্য ও স্বল্প-কার্বন জ্বালানির দিকে রূপান্তর করা যায়।
পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের পুনরায় চালু হওয়া তাই শুধু একটি কারিগরি ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের বিদ্যুৎ নিরাপত্তা, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং জ্বালানি রূপান্তরের জটিল বাস্তবতার প্রতিফলন।
আরো পড়ুন: