৫০০ বিলিয়ন ডলারের মহাপরিকল্পনা; ওয়াশিংটন-নয়াদিল্লি জ্বালানি চুক্তির নেপথ্যে নতুন ভূ-রাজনীতি

৫০০ বিলিয়ন ডলারের মহাপরিকল্পনা; ওয়াশিংটন-নয়াদিল্লি জ্বালানি চুক্তির নেপথ্যে নতুন ভূ-রাজনীতি
প্রতীকী ছবি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ১৯:৫৯

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের সমীকরণ বদলে দিয়ে এক ঐতিহাসিক চুক্তিতে উপনীত হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত। রাশিয়ার সস্তা তেলের ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতা কাটিয়ে বিপুল পরিমাণ মার্কিন জ্বালানি আমদানির বিনিময়ে ভারতীয় পণ্যের ওপর থেকে অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ 'শাস্তিমূলক' শুল্ক প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই সিদ্ধান্তটি কেবল একটি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি নয়, বরং ইউক্রেন যুদ্ধের আবহে রাশিয়ার অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার লক্ষে ওয়াশিংটনের একটি সুদূরপ্রসারী কৌশলগত বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। হোয়াইট হাউস থেকে জারি করা নির্বাহী আদেশ অনুযায়ী, ভারত এখন থেকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রুশ তেল আমদানি বন্ধ রাখার আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক শীতলতা কাটানোর পথে এক বড় মাইলফলক।

এই চুক্তির কেন্দ্রীয় স্তম্ভ হলো জ্বালানি ও প্রযুক্তিতে ভারতের এক বিশাল বিনিয়োগের অঙ্গীকার। আগামী পাঁচ বছরে নয়াদিল্লি যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ৫০০ বিলিয়ন (৫০ হাজার কোটি) ডলারের পণ্য আমদানির পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) এবং কোকিং কোল। ভারতের ক্রমবর্ধমান ইস্পাত শিল্প ও বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে মার্কিন কোকিং কোল এবং উন্নত প্রযুক্তি একটি শক্তিশালী বিকল্প হিসেবে কাজ করবে। এর ফলে একদিকে যেমন রাশিয়ার জ্বালানি রাজস্বে বড় ধরনের ধস নামার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে মার্কিন শেল গ্যাস ও কয়লা খনিগুলোর জন্য এক বিশাল ও স্থায়ী বাজার উন্মুক্ত হলো। এছাড়া আগামী ১০ বছরের জন্য দুই দেশের মধ্যে নতুন প্রতিরক্ষা রূপরেখা স্বাক্ষরিত হওয়ায় উচ্চ-প্রযুক্তি এবং খনিজ সম্পদের বিনিময়ে নতুন এক সামরিক-অর্থনৈতিক বলয় গড়ে ওঠার পথ প্রশস্ত হয়েছে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার ‘ইউরাল’ গ্রেডের তেল মূলত ভারী এবং সালফারযুক্ত, যা ভারতীয় শোধনাগারগুলোর জন্য বিশেষভাবে উপযোগী ছিল। এখন মার্কিন ‘সুইট ক্রুড’ বা হালকা মানের তেলে ফিরে আসা ভারতীয় তেল শোধনাগারগুলোর জন্য একটি বড় কারিগরি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ বা ওএনজিসি-র মতো সংস্থাগুলোকে তাদের শোধনাগার এবং এলএনজি রিগ্যাসিফিকেশন টার্মিনালগুলোর আধুনিকায়নে বিপুল বিনিয়োগ করতে হবে। তবে এই রূপান্তরের বিনিময়ে ভারত মার্কিন বাজারে তথাকথিত ‘পারস্পরিক’ শুল্কের ক্ষেত্রে বড় ছাড় পাচ্ছে। শুল্কের হার ১৮ শতাংশে নেমে আসায় টেক্সটাইল, ওষুধ এবং প্রকৌশল পণ্যের ক্ষেত্রে ভারত এখন এশীয় প্রতিদ্বন্দ্বী চীন বা ভিয়েতনামের তুলনায় বেশি প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে, যাদের জন্য এই হার এখনও ১৯ থেকে ২০ শতাংশের ঘরে রয়েছে।

এই চুক্তির স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে ওয়াশিংটন একটি অত্যন্ত কঠোর মনিটরিং প্যানেল গঠন করেছে। মার্কিন বাণিজ্য সচিবকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন রিয়েল-টাইম ডেটার মাধ্যমে ভারতের জ্বালানি আমদানির ধরন পর্যবেক্ষণ করা হয়। যদি দেখা যায় যে ভারত পুনরায় রাশিয়ার তেল কেনা শুরু করেছে, তবে ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনরায় কার্যকর হবে। এই ‘অটোমেটিক রিয়েমপোজিশন’ মেকানিজম প্রমাণ করে যে ট্রাম্প প্রশাসন ভারতের ওপর তাদের জ্বালানি নীতি কঠোরভাবে চাপিয়ে দিতে বদ্ধপরিকর। সব মিলিয়ে এই চুক্তিটি বৈশ্বিক জ্বালানি রাজনীতিতে এমন এক নতুন মেরুকরণের সংকেত দিচ্ছে, যেখানে ভারতের মতো উদীয়মান শক্তিগুলোকে এখন রাশিয়ার সস্তা জ্বালানি এবং পশ্চিমা বাজারের একচেটিয়া সুবিধার মধ্যে একটিকে বেছে নিতে হচ্ছে।