আগামী গ্রীষ্মে ব্যাপক লোডশেডিংয়ের আশঙ্কা বিআইপিপিএ'র

আগামী গ্রীষ্মে ব্যাপক লোডশেডিংয়ের আশঙ্কা বিআইপিপিএ'র

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ১৭:৪১

আপডেট: ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ১৯:০৯

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) কাছে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক দেশীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর বকেয়া পাওনা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। দ্রুত বকেয়া শোধ করা না হলে পবিত্র রোজা ও গ্রীষ্মে জ্বালানি সংকটের কারণে ব্যাপক লোডশেডিংয়ের আশঙ্কা রয়েছে। 

সোমবার রাজধানীর একটি হোটেলে ‘বিদ্যুৎ খাতে বৈষম্যমূলক আচরণ, চুক্তি লঙ্ঘন ও বিনিয়োগ আস্থার সংকট’ শিরোনামে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশন (বিআইপিপিএ) এমন দাবি করেছে। 

সংগঠনটির সভাপতি কে এম রেজাউল হাসনাত, সাবেক সভাপতি ইমরান করিমসহ অন্যান্য নেতারা এতে উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এক বছর আগেও বকেয়া ছিল নয় হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে আরও পাঁচ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে। প্রতিষ্ঠানভেদে আট থেকে ১০ মাস পর্যন্ত বিল বকেয়া রয়েছে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের ওঠানামা ও ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের চাপ মিলিয়ে কোম্পানিগুলোর আর্থিক ক্ষতি প্রায় আট হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান দৈনন্দিন ব্যয় ও জ্বালানি আমদানির অর্থ জোগাতে বাধ্য হয়ে উচ্চ সুদে ঋণ নিচ্ছে।

বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ে বিল পরিশোধ না হলে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থগিত রাখার আইনি সুযোগ থাকলেও জাতীয় স্বার্থের কথা বিবেচনা করে দেশীয় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো তা করেনি। ধার করে হলেও তারা জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কেন্দ্র মালিকদের অভিযোগ, আর্থিক সংকটে উৎপাদন সীমিত হলে জাতীয় লোড বণ্টন কেন্দ্র বাস্তব চাহিদার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ চাহিদা দেখিয়ে ক্ষতিপূরণমূলক জরিমানা বাড়িয়েছে। তাদের মতে, এই জরিমানার মাধ্যমে কাগজে-কলমে বিপিডিবির বকেয়া কম দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বকেয়া বিল থেকে জরিমানা কেটে নেওয়া হয়েছে। অন্যগুলোর ক্ষেত্রে এ প্রক্রিয়া চলমান।

এই সংকট দীর্ঘায়িত হলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে বলে সংবাদ সম্মেলনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়। বলা হয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি আমদানি এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

সংগঠনটির সভাপতি কে এম রেজাউল হাসনাত বলেন, 'বকেয়ার টাকা না পেলে জ্বালানি তেল আমদানি ও বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়বে। আসন্ন গ্রীষ্মে বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়াতে পারে। সময়মতো অর্থ পরিশোধ না হলে লোডশেডিংয়ের আশঙ্কা বাড়বে। এ অবস্থায় রমজানের আগেই বকেয়ার বড় অংশ পরিশোধ করা জরুরি।'

তিনি বলেন, 'নতুন সরকার এসেই বকেয়া শোধের চাপে পড়বে। বকেয়ার ৬০ শতাংশ পরিশোধ করা হলে চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে। ৩ থেকে ৪ মাসের বকেয়া থাকলে বিদ্যুৎকেন্দ্র চালিয়ে নেওয়া যায়।'

উল্লেখ্য, চুক্তি অনুসারে দেশের সব বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনে নেয় পিডিবি। মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বছরে ১০ শতাংশ সময় উৎপাদন বন্ধ রাখতে (আউটেজ) পারে একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র। এর বাইরে বন্ধ রাখার সময় কেন্দ্রভাড়া (ক্যাপাসিটি পেমেন্ট) পাবে না তারা। জরিমানা দিতে হবে তাদের। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বকেয়া বিল জমতে থাকায় তারা বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে অস্বীকৃতি জানালে ২০২২ সালের জুলাই থেকে বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রাখার সময় হিসাব না করেই বিদ্যুৎ বিল দিতে থাকে পিডিবি। বিদ্যুৎ বিভাগের অনুমোদন ছাড়াই পিডিবির বোর্ডে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকার এসে এটি বাতিল করে জরিমানা আদায়ের সিদ্ধান্ত নেয়। ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত জরিমানা, অতিরিক্ত কেন্দ্রভাড়া সুদসহ আদায়ের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে ২ ফেব্রুয়ারি সিদ্ধান্ত নেয় পিডিবি।

বিআইপিপিএ'র সংবাদ সম্মেলনে এ জরিমানা আদায়ের বিরোধিতা করা হয়। সম্মেলনে বলা হয়, চুক্তি অনুসারে পিডিবি বিদ্যুৎ বিল দিতে না পারলে বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদন বন্ধ রাখতে পারে। বিপুল বকেয়া থাকলেও বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে। বকেয়াজনিত আর্থিক সমস্যার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন যখন সীমিত করতে বাধ্য হয়েছে, ওই সময় অপর্যাপ্ত সরবরাহ দেখিয়ে জরিমানা হিসাব করা হয়েছে। এতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে। পিডিবির নিজস্ব ব্যর্থতার দায় বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর চাপানো আইন ও চুক্তির পরিপন্থী।

বিআইপিপিএ বলছে, দেশীয় ও বিদেশি কোম্পানির ক্ষেত্রে জরিমানার বিধান ভিন্ন ভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে। ৩০টি ফার্নেস কেন্দ্রের জরিমানা কর্তনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের কাছে নালিশ দিলেও সেটি খারিজ করে দিয়েছে তারা। রোজা ও সেচ মৌসুমের আগে এ ধরনের বিরোধ বিদ্যুৎখাতে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে।

এ বিষয়ে বিআইপিপিএ সভাপতি কে এম রেজাউল হাসনাত বলেন, 'নতুন সরকার গঠনের পর এক থেকে দেড় মাস সময় লাগে গুছিয়ে আনতে। নতুন সরকারকে বিপদে ফেলার কোনো ইচ্ছা নেই আমাদের। তারা হুমকিও দিচ্ছেন না, বাস্তবতা তুলে ধরেছেন। নতুন সরকার আসার কয়েক দিন আগে ইচ্ছাকৃত ভাবে জরিমানা কাটার ব্যবস্থা নিয়েছে। একটি ঝামেলা তৈরি করতেই এটি করা হয়েছে।'