পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না থাকায় চট্টগ্রামের আনোয়ারায় অবস্থিত দুটি সার কারখানার উৎপাদন অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রেখেছে কর্তৃপক্ষ। বুধবার বিকেল থেকে সরকারি উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশনায় কারখানা দুটিতে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
কারখানা দুটি হলো- চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল) ও কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (কাফকো)।
ইউরিয়া সার উৎপাদনের মূল কাঁচামালই হলো প্রাকৃতিক গ্যাস। গ্যাসের দহন ও রাসায়নিক প্রক্রিয়া ছাড়া অ্যামোনিয়া বা ইউরিয়া তৈরি করা অসম্ভব।
সিইউএফএল এবং কাফকো সূত্র জানিয়েছে, শুধু গ্যাস থাকলেই হয় না, উৎপাদনের জন্য নির্দিষ্ট মাত্রার চাপের প্রয়োজন হয়। বর্তমানে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের চাপ এতই নিচে নেমে গেছে, এই অবস্থায় উৎপাদন প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়া শুধু কঠিনই নয়, বরং যন্ত্রপাতির জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ।
বন্ধ হয়ে যাওয়া এই দুই কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা দেশের সার চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণ করে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সিইউএফএল প্রতিদিন প্রায় ১১০০ থেকে ১২০০ টন ইউরিয়া উৎপাদন করে। কাফকো বহুজাতিক এই প্রতিষ্ঠানটি দৈনিক প্রায় ১৭২৫ টন ইউরিয়া এবং ১৫০০ টন অ্যামোনিয়া উৎপাদন করতে সক্ষম।
হিসাব করলে দেখা যায়, এই দুটি কারখানা বন্ধ থাকায় প্রতিদিন প্রায় তিন হাজার টন ইউরিয়া সার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দেশ। দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে কেবল দেশীয় উৎপাদনই ব্যাহত হবে না, বরং আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা বাড়বে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে।
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সিইউএফএলের জন্য এই বন্ধ হওয়া নতুন কিছু নয়। গত বছরের ০১ নভেম্বর দীর্ঘ সাড়ে ছয় মাস বন্ধ থাকার পর অনেক প্রত্যাশা নিয়ে কারখানাটি চালু করা হয়েছিল। কিন্তু চালুর পর থেকেই যান্ত্রিক ত্রুটি এবং অনিয়মিত গ্যাস সরবরাহের কারণে বার বার উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। সাধারণ শ্রমিকদের মধ্যে এখন হতাশা কাজ করছে। তাদের মতে, কারখানাটি যখনই পুরোদমে চালু হওয়ার পর্যায়ে আসে, তখনই কোনো না কোনো সংকটে তা আবার স্থবির হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক মানের সার কারখানা কাফকোও গত বছরের অক্টোবরে অভ্যন্তরীণ যান্ত্রিক সমস্যায় দুই সপ্তাহ বন্ধ ছিল। সেই ধাক্কা কাটিয়ে না উঠতেই এবার জাতীয় পর্যায়ের গ্যাস সংকট তাদের জন্য বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়াল।
কাফকোর কারিগরি বিভাগের একজন প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, 'কম চাপে প্ল্যান্ট চালানো মানে হলো কোটি কোটি টাকার মূলধনী যন্ত্রপাতির দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি করা। তাই নিরাপত্তার স্বার্থেই উৎপাদন স্থগিত রাখা হয়েছে।'
সিইউএফএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিজানুর রহমান বলেন, 'গ্যাস সংকটের কারণে সরকারের নির্দেশনায় কারখানার উৎপাদন সাময়িক ভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হলে কারখানাটি পুনরায় চালু করা হবে।'
বাংলাদেশে সাধারণত রবি মৌসুম এবং সামনে আসা আউশ ও আমন চাষের প্রস্তুতির সময় ইউরিয়া সারের ব্যাপক চাহিদা থাকে। চট্টগ্রামের এই দুই কারখানা থেকে উৎপাদিত সার নৌ ও সড়কপথে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বাফার গুদামগুলোতে পাঠানো হয়। সেখান থেকে তা পৌঁছায় ডিলারদের মাধ্যমে কৃষকের হাতে।
কৃষি সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক ও উৎপাদন শুরু না হলে বাজারে সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি হতে পারে। প্রান্তিক কৃষকরা যদি সময়মতো সার না পান, তবে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ফসল উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আনোয়ারা এলাকার কৃষক আলাউদ্দিন আক্ষেপ করে বলেন, 'শুনেছি কারখানায় সার উৎপাদন বন্ধ। সময়মতো দোকানদাররা সারের দাম বাড়িয়ে দিলে আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যাবে।'
বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিআইসি) সূত্র জানায়, গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলা এবং সরকারের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ বাড়লে এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের চাহিদা কিছুটা কমলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সার কারখানায় গ্যাস দেওয়া হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার অভাব এখন শিল্পখাতের জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে ডলার সংকটে এলএনজি আমদানিতে ধীরগতি, অন্যদিকে দেশীয় গ্যাস ক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমে আসা- সব মিলিয়ে এক অস্থির সময় পার করছে জ্বালানি খাত। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে কৃষিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। আর কৃষির জন্য অপরিহার্য হলো নিরবচ্ছিন্ন সার সরবরাহ। চট্টগ্রামের এই দুই বৃহৎ কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকা মানে হলো জাতীয় সক্ষমতায় কুঠারাঘাত।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, সরকার দ্রুত বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস নিশ্চিত করে কারখানা দুটি পুনরায় সচল করবে। অন্যথায়, সারের জন্য বিদেশের ওপর নির্ভরশীলতা কেবল ব্যয়ই বাড়াবে না, দেশের শিল্প অবকাঠামোকেও দুর্বল করে দেবে।
Tag:
আরো পড়ুন: