হরমুজ পেরিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে ১৫ জাহাজ, এলএনজি ও জ্বালানি সরবরাহে সাময়িক স্বস্তি

হরমুজ পেরিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে ১৫ জাহাজ, এলএনজি ও জ্বালানি সরবরাহে সাময়িক স্বস্তি
ছবি: সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৭ মার্চ, ২০২৬ ২১:১৪

আপডেট: ৮ মার্চ, ২০২৬ ১২:৪৯

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে ১৫টি কার্গো জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাতে শুরু করেছে। এসব জাহাজে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) এবং সিমেন্ট শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল ক্লিংকারসহ বিপুল পরিমাণ পণ্য এসেছে, যা জ্বালানি ও শিল্প খাতে সাময়িক স্বস্তি এনে দিয়েছে।

বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ১৫টি জাহাজের মধ্যে ইতোমধ্যে ১২টি চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করেছে এবং বাকি তিনটি জাহাজ চলতি সপ্তাহের মধ্যেই পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এসব জাহাজে মোট প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার টন পণ্য রয়েছে।

এই চালানগুলো মধ্যপ্রাচ্য থেকে যাত্রা শুরু করেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার আগে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ওই হামলার পর তেহরানের পাল্টা পদক্ষেপের ফলে হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়ে। বিশ্বের মোট তেল ও এলএনজি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, ফলে এর কার্যক্রম ব্যাহত হওয়া বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করে।

চট্টগ্রাম বন্দরে আসা জাহাজগুলোর মধ্যে চারটি এলএনজি বহন করছে, দুটি এলপিজি এবং নয়টি ক্লিংকার নিয়ে এসেছে, যা স্থানীয় সিমেন্ট কারখানাগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল।

বন্দর সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, কাতার থেকে আসা দুটি এলএনজি জাহাজ—আল জুর এবং আল জাসাসিয়া—ইতোমধ্যে বন্দরে পৌঁছেছে। এই দুই জাহাজে মোট প্রায় ১ লাখ ২৬ হাজার টন এলএনজি এসেছে। আরও দুটি এলএনজি জাহাজ, লুসাইল এবং আল ঘালায়েল, আগামী সোমবার ও বুধবার বন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। চারটি জাহাজ মিলিয়ে প্রায় ২ লাখ ৪৭ হাজার টন এলএনজি বাংলাদেশে পৌঁছাবে।

এলএনজি জাহাজগুলোর স্থানীয় এজেন্ট ইউনিগ্লোবাল বিজনেস লিমিটেডের জ্যেষ্ঠ উপ-মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ নুরুল আলম বলেন, নির্ধারিত জাহাজগুলো পৌঁছানোর সম্ভাবনা প্রায় নিশ্চিত। তবে হরমুজ প্রণালির ভেতরে পুরোপুরি বোঝাই করা ‘লিবার্থা’ নামের একটি এলএনজি জাহাজ এখনো আটকে রয়েছে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার অপেক্ষায় আছে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে ভবিষ্যতে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।

এদিকে এলপিজি খাতে ওমানের সোহর বন্দর থেকে ২২ হাজার ১৭২ টন এলপিজি নিয়ে ‘সেভেন’ নামের একটি জাহাজ রবিবার চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়ার কথা রয়েছে। এর আগে একই বন্দর থেকে ১৯ হাজার ৩১৬ টন এলপিজির আরেকটি চালান এসেছে। এসব সরবরাহ মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের সহযোগী প্রতিষ্ঠান মেঘনা ফ্রেশ এলপিজির জন্য নির্ধারিত।

এছাড়া উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশ থেকে ক্লিংকার, জিপসাম, চুনাপাথর এবং শিল্পে ব্যবহৃত রাসায়নিক পদার্থও এসেছে। এর মধ্যে কুয়েতের শুয়াইবা বন্দর থেকে ৫ হাজার টন মনোইথিলিন গ্লাইকোল (এমইজি) আমদানি করা হয়েছে। মোট প্রায় ৫ লাখ ১৫ হাজার টন কাঁচামাল দেশের সিমেন্ট শিল্পের জন্য এসেছে বলে বন্দর সূত্র জানিয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য হরমুজ প্রণালি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ। ইরাক, ইরান, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য অংশের বাণিজ্য এই পথের ওপর নির্ভরশীল। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে এই প্রণালি হয়ে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলারের আমদানি হয়েছে, যার বড় অংশই জ্বালানি পণ্য।

শিল্প খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, বর্তমান চালানগুলো জ্বালানি ও শিল্প খাতে সাময়িক স্বস্তি দিলেও মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে ভবিষ্যতে সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এতে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং শিল্প উৎপাদন উভয়ই প্রভাবিত হতে পারে।