মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা
ছবি: সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৭ মার্চ, ২০২৬ ২১:২২

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় দেশটির অনেক পরিবারের বাজেটে নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে উত্তেজনার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দেওয়ায় দেশটির বিভিন্ন শহরে পেট্রোলের দাম দ্রুত বাড়ছে, যা ভোক্তাদের দৈনন্দিন ব্যয়কে প্রভাবিত করছে।

মার্কিন বিভিন্ন শহরের পেট্রোল পাম্পে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। অনেক চালক ভবিষ্যতে আরও দাম বাড়ার আশঙ্কায় আগেভাগেই জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। রাজধানী ওয়াশিংটনের বাসিন্দা শন রবিনসন, যিনি পেশায় একজন স্কুলশিক্ষক, বলেন এক গ্যালন সাধারণ পেট্রোলের দাম ৩.২৭ ডলারে পৌঁছানো তাকে বিস্মিত করেছে। তার মতে, জ্বালানির এই দাম বৃদ্ধি দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে সরাসরি প্রভাবিত করছে এবং এখন ছোট দূরত্বে গাড়ি চালানোও অনেক সময় বিলাসিতার মতো মনে হচ্ছে।

অন্যান্য অনেক বাসিন্দাও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ওয়াশিংটনের আরেক বাসিন্দা টোলোরিয়া ওয়াশিংটন বলেন, জ্বালানির দাম বাড়লে শুধু পরিবহন নয়, খাদ্য, বাসস্থান ও দৈনন্দিন ব্যয়ের ওপরও প্রভাব পড়ে। তার ভাষায়, অনেক পরিবার এখন খরচ সামলাতে টিকে থাকার লড়াই চালাচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বাড়ার পেছনে মূল কারণ হলো বৈশ্বিক তেলের বাজারে হঠাৎ অস্থিরতা। সাম্প্রতিক সময়ে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯২.৬৯ ডলারে পৌঁছেছে, যা প্রায় ৮.৫ শতাংশ বৃদ্ধি নির্দেশ করে। একই সময়ে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দামও ১২ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯০.৯০ ডলারে উঠেছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের বড় সাপ্তাহিক বৃদ্ধিগুলোর একটি।

এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উঠে এসেছে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের জেরে ইরান ওই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে বলে আন্তর্জাতিক বাজারে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশ্বে মোট অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়, ফলে এর কার্যক্রম ব্যাহত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় প্রভাব পড়ে।

বাজার বিশ্লেষকেরা সতর্ক করছেন, যদি জ্বালানির উচ্চ মূল্য দীর্ঘ সময় ধরে বজায় থাকে, তাহলে তা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে আরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে জ্বালানির ব্যয় বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিতে পারে এবং একই সঙ্গে ফেডারেল রিজার্ভের মূল্য স্থিতিশীলতা বজায় রাখার প্রচেষ্টাকে কঠিন করে তুলতে পারে।

সম্প্রতি প্রকাশিত মার্কিন অর্থনৈতিক সূচকও কিছুটা উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাসে দেশটিতে অপ্রত্যাশিতভাবে প্রায় ৯২ হাজার চাকরি কমেছে এবং খুচরা বিক্রি ০.২ শতাংশ কমেছে। এর সঙ্গে জ্বালানি ব্যয়ের বৃদ্ধি যুক্ত হওয়ায় মধ্য ও নিম্ন আয়ের অনেক পরিবারের ওপর চাপ আরও বেড়েছে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন।

লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি পেট্রোল স্টেশনে অপেক্ষমাণ এক বাসিন্দা লুকাস তামারেন বলেন, জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে প্রতিদিনের জীবন এখন অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। তিনি জানান, এখন প্রতিটি যাত্রার আগে মানুষ হিসাব করে দেখছে কত দূর গাড়ি চালানো জরুরি এবং কোন খরচ কমানো যায়।

রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও এই পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। সামনে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন থাকায় জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি ভোটারদের মনোভাবকে প্রভাবিত করতে পারে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি আশা করছেন জ্বালানির দাম শিগগিরই স্থিতিশীল হবে।

তবে বাজার বিশ্লেষকেরা সতর্ক করছেন যে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত থাকতে পারে এবং তার প্রভাব ভোক্তা ব্যয়, মূল্যস্ফীতি ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর পড়তে পারে।

এই উত্তেজনার প্রভাব শেয়ারবাজারেও পড়েছে। সাম্প্রতিক লেনদেনে ডাও জোন্স সূচক ১.৩ শতাংশ কমে ৪৭,৫০১.৫৫ পয়েন্টে নেমে এসেছে। একই সময়ে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ এবং নাসডাক সূচকও যথাক্রমে ১.৩ এবং ১.৬ শতাংশ কমেছে। ইউরোপীয় বাজারেও অনুরূপ পতন দেখা গেছে, আর এশিয়ার বাজারে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি শুধু পরিবহন ব্যয়ের বিষয় নয়; এটি মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত অব্যাহত থাকলে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অনেক দেশকে জ্বালানি ব্যয়ের নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হতে পারে।