মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতায় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) অবকাঠামো সম্প্রসারণ করা হলে বাংলাদেশ ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও জ্বালানি নিরাপত্তার ‘ঝুঁকিতে’ পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে গ্লোবাল এনার্জি মনিটর (জিইএম)।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি অবকাঠামো নিয়ে কাজ করা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এই গবেষণা সংস্থাটির নতুন এক প্রতিবেদনে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে এমন সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার এ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয় বলে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে জিইএম।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জিইএমের এশিয়া গ্যাস ট্র্যাকার অনুযায়ী- বর্তমানে ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে মোট ১০৭ বিলিয়ন ডলার মূল্যের এলএনজি টার্মিনাল ও গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে অথবা নির্মাণাধীন রয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল জোটের ইরানে হামলা শুরুর পর জ্বালানি বাজারে মূল্যবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে।
একইসঙ্গে কৌশলগত ভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন তৈরি হয়েছে। এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বে তেল ও গ্যাস সরবরাহের বড় একটি অংশ রপ্তানি হয়। এই অস্থির পরিস্থিতিতে দক্ষিণ এশিয়ায় এলএনজি অবকাঠামো দ্রুত সম্প্রসারণ করলে অঞ্চলটি মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ বিঘ্নের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
জিইএমের হিসাবে, দক্ষিণ এশিয়া বর্তমান বিশ্বের মোট উন্নয়নাধীন এলএনজি আমদানি সক্ষমতার ১৭ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করছে, যার পরিমাণ বছরে ১১০.৭ মিলিয়ন টন। একইসঙ্গে বৈশ্বিক গ্যাস পাইপলাইন সম্প্রসারণেরও ১৭ শতাংশ এই অঞ্চলে, যার মোট দৈর্ঘ্য ৩৪ হাজার ১৪৬ কিলোমিটার।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান এমন এলএনজি আমদানি অবকাঠামো পরিকল্পনা করছে যা বাস্তবায়িত হলে তাদের বর্তমান সক্ষমতা প্রায় দ্বিগুণ হবে। অন্যদিকে, ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এলএনজি টার্মিনাল সম্প্রসারণ এবং তৃতীয় বৃহত্তম গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।
প্রতিবেদনটি সতর্ক করে বলেছে, চলতি দশকের শেষ দিকে বৈশ্বিক এলএনজি বাজার তুলনামূলক ভাবে ভারসাম্যে এলেও এই জ্বালানি ভূরাজনৈতিক সংকট, জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন বা সরবরাহ ঘাটতির কারণে হঠাৎ মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকবে না।
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি দেখিয়েছে, এমন সংকট কত দ্রুত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে। এলএনজি আমদানির ওপর ব্যাপক ভাবে নির্ভরশীল উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর ক্ষেত্রে এ ধরনের মূল্য ওঠানামা বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি, শিল্প খাতে বিঘ্ন এবং অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
জিইএমের গ্লোবাল এলএনজি বিশ্লেষক রবার্ট রোজানস্কি বলেন, আমরা আগেও এমন পরিস্থিতি দেখেছি। এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরশীল দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিগুলো এসব মূল্য ধাক্কা সামাল দিতে হিমশিম খাবে। এটি নতুন গ্যাস অবকাঠামো নির্মাণের ঝুঁকির কথা মনে করিয়ে দেয় এবং দেখায় যে দীর্ঘমেয়াদে নবায়নযোগ্য জ্বালানির মতো দেশীয় বিকল্পগুলোই বেশি সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য।
প্রতিবেদনটিতে দক্ষিণ এশিয়ায় এলএনজি অবকাঠামো উন্নয়নে অস্থিরতার একটি প্রবণতার চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। গত এক দশকে ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান যে পরিমাণ এলএনজি আমদানি সক্ষমতা বাস্তবে চালু করেছে, তার দুই থেকে তিনগুণ বেশি প্রকল্প বাতিল বা স্থগিত করেছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় প্রস্তাবিত এলএনজি টার্মিনাল প্রকল্পগুলোর ব্যর্থতার হারও ইউরোপের অনুরূপ প্রকল্পগুলোর তুলনায় বেশি, যা উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোতে গ্যাস অবকাঠামো বিনিয়োগের আর্থিক ও নীতিগত ঝুঁকিকে নির্দেশ করে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত দেখিয়ে দিচ্ছে, দ্রুত সম্প্রসারিত এলএনজি বাজার কত দ্রুত ক্রয়ক্ষমতার সংকটে পরিণত হতে পারে এবং এতে সরকারগুলোকে প্রকল্প বিলম্ব বা বাতিল করতে বাধ্য করতে পারে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পখাতে দেশটি ব্যাপক ভাবে আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে বৈশ্বিক মূল্য অস্থিরতার প্রভাব এখানে বেশি পড়ে।
জিইএমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্বালানি সংকটের মধ্যে বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তরে নীতিগত পরিবর্তন একটি স্থিতিশীল বিকল্প হতে পারে।
জিইএমের তেল-গ্যাস কর্মসূচির পরিচালক জুই জলি বলেন, 'ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর এলএনজির দাম বাড়তে থাকায় এবং সরবরাহ সঙ্কুচিত হওয়ায় বাংলাদেশের নতুন সরকারের জন্য দূরদর্শী সিদ্ধান্ত হবে এলএনজি থেকে সরে এসে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যাওয়া। এলএনজি যে জ্বালানি নিরাপত্তা দিতে পারছে না, নবায়নযোগ্য জ্বালানি তা দিতে পারে।'
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস (আইইএফএ)-এর বাংলাদেশের লিড এনার্জি অ্যানালিস্ট শফিকুল আলম বলেন, 'এলএনজির সঙ্গে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা অত্যন্ত অস্থির ও অনিশ্চিত। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ ঘাটতির কারণে উৎপাদন কমে যাওয়ায় এলএনজিকে সাশ্রয়ী বিকল্প হিসেবে দেখা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে এটি দেশকে অস্থির বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল করে তুলেছে।'
তিনি বলেন, 'এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ, এটি আন্তর্জাতিক জীবাশ্ম জ্বালানির বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ বিঘ্নের ঝুঁকির বিরুদ্ধে একটি নির্ভরযোগ্য সুরক্ষা দিতে পারে।'
দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে এরই মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। গত তিন বছরে পাকিস্তানে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন তিনগুনেরও বেশি বেড়েছে। অন্যদিকে, ভারত ২০৩০ সালের মধ্যে তাদের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ৪০ শতাংশের বেশি নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পূরণ করার পথে রয়েছে।
এদিকে, এনার্জি স্টোরেজ প্রযুক্তি এবং সবুজ হাইড্রোজেনের মতো নতুন প্রযুক্তিগুলো বিদ্যুৎ গ্রিডের ভারসাম্য রক্ষা ও শিল্পখাতে জ্বালানি সরবরাহের বিকল্প সমাধান হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব প্রযুক্তি পরিপক্ব হলে আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরশীলতা উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে যেতে পারে।
Tag:
আরো পড়ুন: