জ্বালানির দাম বাড়লে অর্থনৈতিক চাপে পড়বে বাংলাদেশ: গবেষণা

জ্বালানির দাম বাড়লে অর্থনৈতিক চাপে পড়বে বাংলাদেশ: গবেষণা

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৮ মার্চ, ২০২৬ ১৭:১৯

আপডেট: ২৮ মার্চ, ২০২৬ ১৮:৩৬

বিশ্ব বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে বাংলাদেশের ওপর বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপ পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন গবেষকরা। তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০ ডলার বাড়লে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার ব্যয় বাড়বে। আর দীর্ঘ সময় ধরে দাম ১২০ ডলারের বেশি থাকলে বছরে অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়াতে পারে ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলারে। দেশীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ (প্রতি ডলার ১২২ টাকা হিসাবে) প্রায় ৬১ হাজার কোটি টাকা।

শনিবার সকালে রাজধানীর একটি হোটেলে চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। 

বিসিক শিল্প নগরীতে অবস্থিত এসএমই শিল্পগুলোর জ্বালানি ব্যবহার, কার্বন নিঃসরণ ও ডিকার্বনাইজেশনের সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে এ আয়োজন করা হয়।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, এমন পরিস্থিতিতে দেশের শিল্পখাত নেতিবাচক প্রভাবের মুখে পড়বে, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাত সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকবে। তাই সংকট মোকাবিলায় এখনই বিকল্প জ্বালানি, বিশেষ করে সৌরবিদ্যুতের ওপর জোর দেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের প্রধান গবেষক এম জাকির হোসেন খান। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সহ-গবেষক সাবরিন সুলতানা ও নাজিফা আলম তোরসা। গবেষণায় সহযোগিতা করেন তন্ময় সাহা।

গবেষক এম জাকির হোসেন খান বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ প্রায় ৯৫ শতাংশ জ্বালানির জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০ ডলার বাড়লে দেশের মাসিক ব্যয় প্রায় ৮০ মিলিয়ন ডলার বাড়ে, যা বছরে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। এভাবে দীর্ঘ সময় ধরে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারের কাছাকাছি বা তার বেশি থাকলে বছরে অতিরিক্ত ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হতে পারে।

তিনি বলেন, 'বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য একদিকে সংকট, অন্যদিকে সুযোগ। এখনই যদি জ্বালানি সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া না হয়, তবে ভবিষ্যতে এই সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।'

তিনি আরও বলেন, 'জ্বালানির দাম বাড়লে সরকার দীর্ঘদিন ভর্তুকির মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে না। একপর্যায়ে মূল্য সমন্বয় করতে বাধ্য হলে শিল্পখাতে ‘ডি-ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন’-এর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।'

জাকির হোসেন উল্লেখ করেন, এসএমইখাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বে। দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই এ খাতনির্ভর। ফলে এসএমইখাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে ব্যাপক কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়বে এবং এর প্রভাব পড়বে সামগ্রিক অর্থনীতিতে। গার্মেন্টসের মতো বৃহৎ শিল্পখাতও অনেকাংশে এসএমই'র ওপর নির্ভরশীল; তাই এই খাত দুর্বল হয়ে পড়লে বড় শিল্পও ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।

তিনি বলেন, 'বিশ্বের বিভিন্ন দেশ-  চীন, ভারত, ভিয়েতনামসহ ইউরোপের দেশগুলো- নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে তাদের শিল্পখাতকে টেকসই করেছে। বাংলাদেশেরও একই পথে এগোনোর প্রয়োজন রয়েছে।'

চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের গবেষণায় দেখা যায়, পরিকল্পিত উদ্যোগ নিলে দেশের এসএমই খাত থেকে উল্লেখযোগ্য হারে কার্বন নিঃসরণ কমানো সম্ভব। বিশেষ করে বিসিক শিল্প নগরীগুলো থেকে বছরে ১৪ দশমিক শূন্য ৯ মিলিয়ন টনের বেশি কার্বন নিঃসরণ কমানো যেতে পারে। এর মাধ্যমে কার্বন ক্রেডিট ব্যবস্থার সুবিধা নিয়ে বছরে প্রায় শূন্য দশমিক ৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার রাজস্ব অর্জনের সম্ভাবনাও রয়েছে।

গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়, চীন, ভারত ও ভিয়েতনামের সফলতা অনুসরণ করে বাংলাদেশের এসএমই খাতে বিকেন্দ্রীভূত রুফটপ সোলার প্যানেল ব্যবহার বাড়ানো গেলে পরিচালন ব্যয় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। এতে পরিবেশগত মান বজায় রাখার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে বিশ্ব বাজারে রপ্তানি সক্ষমতাও বৃদ্ধি পাবে।

গবেষণায় দেখা যায়, দেশের মোট শিল্প ইউনিটের ৯০ শতাংশেরও বেশি এসএমইখাতের অন্তর্ভুক্ত। এ খাত শিল্পখাতের প্রায় ৮৫ শতাংশ শ্রম শক্তিকে নিয়োজিত করে এবং জিডিপিতে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ অবদান রাখে। তবে এই গুরুত্বপূর্ণ খাতটি এখনো এমন এক জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল, যেখানে প্রায় ৯৫ শতাংশ বিদ্যুৎ জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক- যা বিশ্ব বাজারের অস্থিতিশীলতার কারণে উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।

বাংলাদেশের এনডিসি ৩ দশমিক শূন্য লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে জ্বালানি খাত থেকে ৬৯ দশমিক ৮৪ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনে শিল্পখাতে জ্বালানির রূপান্তর এখন অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে।

গবেষণায় বিসিক শিল্প নগরীর চামড়া, প্লাস্টিক উৎপাদন, প্লাস্টিক প্যাকেজিং এবং হালকা প্রকৌশল- এই চারটি খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এসব খাত মিলিয়ে বছরে প্রায় ৪৬ দশমিক ৯৯ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ হয়। তবে যথাযথ প্রযুক্তি ও উদ্যোগ গ্রহণ করলে কারিগরি দিক থেকে বছরে প্রায় ১৪ দশমিক শূন্য ৯৭ মিলিয়ন টন কার্বন নিঃসরণ কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিভিন্ন শিল্পে কার্বন নিঃসরণ কমানোর উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে চামড়া শিল্পে ১৯ থেকে ৩৩ শতাংশ, হালকা প্রকৌশল শিল্পে ১৯ থেকে ৩১ শতাংশ, প্লাস্টিক শিল্পে সর্বোচ্চ ৩৩ থেকে ৪৯ শতাংশ এবং প্যাকেজিং শিল্পে ১৫ থেকে ২৮ শতাংশ পর্যন্ত নিঃসরণ হ্রাস করা সম্ভব।

গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়, বিসিক শিল্প নগরীর মাত্র ১০ শতাংশ খালি জায়গা ব্যবহার করেই প্রায় ৫৭ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলা সম্ভব। এর মাধ্যমে বছরে ৮২ হাজার ৯৬৮ মেগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে এবং প্রায় ৫১ হাজার ৪৪০ দশমিক ৭১ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ কমানো সম্ভব হবে।

এ খালি জায়গার ব্যবহার ২০ শতাংশে উন্নীত করা গেলে উৎপাদন সক্ষমতা বেড়ে ১১৪ মেগাওয়াটে পৌঁছাবে। তখন বছরে প্রায় ১ লাখ ৬৫ হাজার ৯৩৭ মেগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে, যা প্রায় ১ লাখ ২ হাজার ৮৮১ দশমিক ৪১ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ হ্রাসে সহায়ক হবে।