রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার বিস্তীর্ণ কৃষিজমির নিচে লুকিয়ে থাকা কয়লা ও লৌহসমৃদ্ধ খনিজ সম্পদ আবারও নীতিনির্ধারকদের নজরে আসছে। দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত এই সম্পদ নিয়ে নতুন করে মূল্যায়ন শুরু হওয়ায় সম্ভাবনা যেমন জেগেছে, তেমনি সামনে এসেছে পরিবেশ ও সামাজিক প্রভাবের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও।
সরকারি কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, অতীতের অনুসন্ধান তথ্য পুনর্মূল্যায়ন এবং সাম্প্রতিক জরিপের ফলাফল খালাশপীর কয়লাক্ষেত্র ও আশপাশের এলাকায় উল্লেখযোগ্য সম্পদের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনের আগে প্রয়োজন আধুনিক ও পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা।
এই অঞ্চলে কয়লার অস্তিত্ব প্রথম শনাক্ত হয় ১৯৫৯ থেকে ১৯৬২ সালের মধ্যে, যখন তৎকালীন পাকিস্তান ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা গন্ডোয়ানা বেসিন এলাকায় অনুসন্ধান চালায়। পরবর্তীতে ১৯৮৯-৯০ সালে বাংলাদেশের ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর প্রায় ২৫ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ড্রিলিং করে ২৫৭ থেকে ৪৫১ মিটার গভীরে উচ্চমানের বিটুমিনাস কয়লার উপস্থিতি নিশ্চিত করে।
প্রাথমিকভাবে সীমিত এলাকায় প্রায় ১৪৩ মিলিয়ন মেট্রিক টন কয়লার মজুদ অনুমান করা হলেও, পরবর্তী গবেষণাগুলোতে এই পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। ২০০৬ সালে চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট কর্পোরেশন প্রায় ৭০৫ মিলিয়ন টনের বেশি মজুদের সম্ভাবনা তুলে ধরে। একই সময়ে আরেকটি মূল্যায়নে বিস্তৃত এলাকায় প্রায় ৬৮৫ মিলিয়ন টনের কাছাকাছি মজুদের কথা উল্লেখ করা হয়।
এত বড় সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও খালাশপীর কয়লাক্ষেত্র এখনও অনাবিষ্কৃত অবস্থায় রয়েছে। ২০০৯ সালে হাইড্রোকার্বন ইউনিটের একটি পর্যালোচনায়, আন্তর্জাতিক পরামর্শকদের সহায়তায়, পূর্ববর্তী গবেষণায় বেশ কিছু ঘাটতি চিহ্নিত করা হয় এবং একটি পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা সমীক্ষার সুপারিশ করা হয়।
কয়লার পাশাপাশি পীরগঞ্জ এলাকায় লৌহসমৃদ্ধ খনিজের সম্ভাবনাও নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। ১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে এর প্রাথমিক ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও, ১৯৯৯-২০০০ সালে GSB-এর ড্রিলিং এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে লৌহ ও অন্যান্য ধাতব উপাদানের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে।
বর্তমানে ছোট পাহাড়পুর এলাকায় নতুন করে অনুসন্ধান কার্যক্রম চলছে, যেখানে মজুদের পরিমাণ ও গুণগত মান নির্ধারণে আরও ড্রিলিং ও ল্যাবরেটরি বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব তথ্য ছাড়া বাণিজ্যিক সম্ভাবনা নিরূপণ করা সম্ভব নয়।
এই সম্পদ দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার এবং শিল্পখাতে কাঁচামালের চাহিদা মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে ঘনবসতিপূর্ণ ও কৃষিনির্ভর এলাকায় খনন কার্যক্রম শুরু হলে জমি ব্যবহার, পরিবেশগত ক্ষতি এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, ভবিষ্যতে যেকোনো উন্নয়ন কার্যক্রমের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বৈজ্ঞানিক তথ্য, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং পরিবেশগত মানদণ্ডের ভিত্তিতে।
একজন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান, “সম্ভাবনা নিঃসন্দেহে বড়, কিন্তু যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে হবে সুপরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে।”
আরো পড়ুন: