জ্বালানি সংকটে বছরে ৬১ হাজার কোটি টাকার চাপের আশঙ্কা: ডিসিসিআই

জ্বালানি সংকটে বছরে ৬১ হাজার কোটি টাকার চাপের আশঙ্কা: ডিসিসিআই

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৯ এপ্রিল, ২০২৬ ২০:০১

বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছে ঢাকা চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)। সংগঠনটির মতে, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বছরে প্রায় ৬১,০০০ কোটি টাকার অতিরিক্ত বোঝা বহন করতে হতে পারে দেশকে।

বৃহস্পতিবার রাজধানীতে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকিন আহমেদ এই আশঙ্কার কথা তুলে ধরেন। “বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবেলা: বাংলাদেশের উপর প্রভাব ও করণীয়” শীর্ষক আলোচনায় তিনি বলেন, জ্বালানির জন্য প্রায় পুরোপুরি আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা বাংলাদেশের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশই আমদানির মাধ্যমে পূরণ হয়, ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা সরাসরি প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই ঝুঁকি আরও বাড়ছে।

ডিসিসিআইর হিসাব বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম যদি ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারের ওপরে থাকে, তাহলে বাংলাদেশকে বছরে অতিরিক্ত ৪ থেকে ৫ হাজার ডলার ব্যয় করতে হতে পারে। একই সঙ্গে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও জ্বালানি ভর্তুকির চাপও বাড়বে।

ইতোমধ্যে জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে। মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি, রাজস্ব ঘাটতি বিস্তৃত হওয়া এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়ার বিষয়গুলো উল্লেখ করেন তিনি। তেলের দাম প্রতি ১০ ডলার বাড়লে দেশের ব্যয় প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার বাড়তে পারে বলেও জানান তিনি।

রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন-এর আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ইতোমধ্যে ৪৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।

জ্বালানি সংকটের প্রভাব শিল্প খাতেও স্পষ্ট। গ্যাস সরবরাহ প্রায় ৪০ শতাংশ কমে যাওয়ায় অনেক কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, আর বিদ্যুতের ঘাটতি ৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে এবং রপ্তানি প্রতিযোগিতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিশেষ করে তৈরি পোশাক, সিমেন্ট, ইস্পাত ও ওষুধ শিল্পে এর প্রভাব বেশি পড়ছে। পরিবহন ব্যয় ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে, আর কনটেইনার সারচার্জ ৫০০ থেকে ৪,০০০ ডলার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ায় রপ্তানি পণ্যের দামও বাড়ছে।

সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও এর প্রভাব বিস্তৃত হচ্ছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা জ্বালানি সংকটকে বড় বাধা হিসেবে দেখছেন, গ্রামীণ এলাকায় দীর্ঘ সময় লোডশেডিং চলছে, এবং ডিজেলের দাম বাড়ায় সেচ ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে—যা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় জ্বালানি উৎস বৈচিত্র্যকরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি চুক্তি নিশ্চিত করা এবং অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন ডিসিসিআই সভাপতি। পাশাপাশি ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ, জ্বালানি ব্যবহারে সংযম এবং রপ্তানিমুখী শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার পরামর্শ দেন তিনি।

তার মতে, সময়োপযোগী ও সমন্বিত জ্বালানি নীতি গ্রহণ না করা হলে অর্থনীতি ধীরে ধীরে কাঠামোগত সংকটে পড়ে যেতে পারে, যা দেশের প্রবৃদ্ধি ও শিল্পখাতের প্রতিযোগিতাকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।