বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎ উৎপাদনে। তীব্র জ্বালানি সংকটের কারণে খুলনা অঞ্চলের ১০টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৬টিই বর্তমানে উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। এর ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এই শিল্পনগরীতে বিদ্যুৎ ঘাটতি প্রকট আকার ধারণ করেছে এবং জনজীবনে নেমে এসেছে স্থবিরতা।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ইরান, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান সংঘাত আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ চেইনকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। যার ফলে আমদানিনির্ভর ফার্নেস অয়েলের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের স্থানীয় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো প্রয়োজনীয় জ্বালানি পাচ্ছে না। খুলনা অঞ্চলে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে।
বন্ধ হয়ে যাওয়া কেন্দ্রগুলোর তালিকায় রয়েছে খুলনা ৩৩০ মেগাওয়াট পাওয়ার প্ল্যান্ট, ফরিদপুর ৫০ মেগাওয়াট প্ল্যান্ট, নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার কোম্পানির ২২৫ মেগাওয়াট প্ল্যান্টসহ মধুমতী ১০০ মেগাওয়াট ও রূপসা ১০৫ মেগাওয়াট কেন্দ্র। খুলনা ৩৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী মো. আলমগীর মাহফুজুর রহমান জানিয়েছেন, তাদের কেন্দ্রটি কারিগরিভাবে পুরোপুরি প্রস্তুত থাকলেও শুধুমাত্র জ্বালানি সরবরাহ না থাকায় এবং জাতীয় গ্রিড থেকে নির্দেশনা না পাওয়ায় উৎপাদন শুরু করা যাচ্ছে না।
গ্রীষ্মের এই সময়ে খুলনা অঞ্চলে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৬০০ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে। কয়লাভিত্তিক রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ ক্ষমতায় সচল থাকলেও তা এই বিপুল চাহিদা মেটাতে যথেষ্ট নয়। ফলে শহর ও গ্রামাঞ্চলে প্রতিদিন গড়ে ৩ থেকে ৫ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ তার জ্বালানি আমদানির জন্য কৌশলগত ‘হরমুজ প্রণালি’র ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীল, যা দেশটিকে বৈশ্বিক যেকোনো ধাক্কার মুখে নাজুক করে তুলছে। পারস্য উপসাগরে সামান্য অস্থিরতাও যে দেশের বিদ্যুৎ খাতকে পঙ্গু করে দিতে পারে, খুলনার বর্তমান পরিস্থিতি তারই প্রমাণ।
এই সংকট থেকে উত্তরণে বিশেষজ্ঞরা এখন জীবাশ্ম জ্বালানি ছেড়ে নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে নজর দেওয়ার তাগিদ দিচ্ছেন। তাদের মতে, ফার্নেস অয়েল থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রতি ইউনিটের খরচ যেখানে ১৮ টাকার বেশি, সেখানে সৌরবিদ্যুতের খরচ মাত্র ৯ টাকার কাছাকাছি। পরিবেশবিদরা বলছেন, আমদানিনির্ভরতা কমাতে এবং টেকসই বিদ্যুৎ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন, সৌর সরঞ্জামের ওপর থেকে কর প্রত্যাহার এবং দ্রুত এই সংক্রান্ত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা এখন সময়ের দাবি।
আরো পড়ুন: