বাংলাদেশের পথে ক্রুডবাহী ট্যাংকার

বাংলাদেশের পথে ক্রুডবাহী ট্যাংকার

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১ এপ্রিল, ২০২৬ ১৭:২২

অপরিশোধিত জ্বালানি নিয়ে সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশের পথে রওয়ানা দিয়েছে ট্যাংকার জাহাজ ‘এমটি নিনেমিয়া’। যেটিতে রয়েছে এক লাখ টন ক্রুড। মঙ্গলবার বাংলাদেশের স্থানীয় সময় সকাল ৬টায় জাহাজটি সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে যাত্রা করে। 

ইস্টার্ন রিফাইনারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী শরীফ হাসনাত এ তথ্য জানান। তবে, জাহাজটি কবে বাংলাদেশে পৌঁছাবে সে বিষয়ে নিশ্চিত করতে পারেননি তিনি। 

এর আগে ক্রুড অয়েল সংকটে পড়ে রাষ্ট্রীয় একমাত্র পেট্রোলিয়াম জ্বালানি পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির (ইআরএল) মূল প্ল্যান্ট বন্ধ হয়ে যায়। এবার ক্রুডের জাহাজ আসার খবরে পরিশোধনাগারটি নিয়ে তৈরি হওয়া ধোঁয়াশা কাটবে। 

তবে সৌদি আরবের তাস তানুরা বন্দরে আটকা এক লাখ টন ক্রুড অয়েলবাহী আরেক জাহাজের বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে যাত্রার বিষয়ে নিশ্চয়তা মিলছে না।

বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে বছরে প্রায় ৭২ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে ৯২ শতাংশ আমদানি করে চাহিদা মেটাতে হয় সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনকে (বিপিসি)। অবশিষ্ট ৮ শতাংশ স্থানীয় উৎস থেকে পাওয়া যায়। সরবরাহকৃত জ্বালানির মধ্যে ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি পরিশোধন করে ইআরএল।

বিপিসি বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে বিপিসির অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে ৬৮ লাখ ৩৫ হাজার ৩৪১ টন জ্বালানি তেল বিক্রি হয়েছে। এরমধ্যে সর্বাধিক ব্যবহার হয়েছে পরিবহন খাতে। পরিবহন খাতে মোট বিক্রি হয়েছে ৬৩ দশমিক ৪১ শতাংশ জ্বালানি। পাশাপাশি কৃষিতে ১৫ দশমিক ৪১ শতাংশ, শিল্পে ৫ দশমিক ৯৬ শতাংশ, বিদ্যুতের ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ, গৃহস্থালীতে শূন্য দশমিক ৯৬ শতাংশ এবং ২ দশমিক ৫৯ শতাংশ ব্যবহার হয়েছে অন্যান্য খাতে।

ব্যবহৃত জ্বালানি পণ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছে ডিজেল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ডিজেল বিক্রি হয়েছে ৪৩ লাখ ৫০ হাজার ৭৫ টন, যা মোট বিক্রির ৬৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ। ফার্নেস অয়েল ৮ লাখ ৭৮ হাজার ৮৮ টন, যা মোট বিক্রির ১২ দশমিক ৮৫ শতাংশ। পেট্রোল ৪ লাখ ৬২ হাজার ৪৭৫ টন, যা মোট ব্যবহারের ৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ। অকটেন ৪ লাখ ১৫ হাজার ৬৫৩ টন, যা মোট ব্যবহারের ৬ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। কেরোসিন ৬৭ হাজার ৪৭৭ টন, যা মোট ব্যবহারের শূন্য দশমিক ৯৯ শতাংশ। জেট ফুয়েল ৫ লাখ ৪৭ হাজার ৮০৪ টন, যা মোট ব্যবহারের ৮ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ এবং অন্যান্য খাতে ১ লাখ ১৩ হাজার ৭৬৯ টন, যা মোট ব্যবহারের ১ দশমিক ৬৬ শতাংশ পেট্রোলিয়াম পণ্য রয়েছে। দেশের মোট ২৭টি ডিপোর মাধ্যমে এসব জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হয়।

এর মধ্যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৭ লাখ ৩২ হাজার ২৩০ টন ডিজেল, ৩ লাখ ৮৬ হাজার ২২৯ টন ফার্নেস অয়েল, ৫৯ হাজার ১৫০ টন পেট্রোল, ৫৬ হাজার ৯৩৪ টন কেরোসিন, ৫৭ হাজার ৪১৪ টন বিটুমিন, ১৬ হাজার ১৮৭ টন এলপিজি, ৮ হাজার ৭১ টন জেবিও এবং এক লাখ ৫৩ হাজার ৫২৯ টন ন্যাফতা পরিশোধন করে বিপিসিকে সরবরাহ করেছে ইআরএল।

ইস্টার্ন রিফাইনারিতে ব্যবহৃত শতভাগ ক্রুড অয়েল আমদানি করতে হয়। বাংলাদেশ জিটুজি পদ্ধতিতে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এসব ক্রুড আমদানি করে। বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন (বিএসসি) আমদানিকৃত এসব ক্রুড পরিবহন করে থাকে। বিএসসি এসব ক্রুড পরিবহনের জন্য বর্তমানে আমেরিকান প্রতিষ্ঠান নর্ভিক এনার্জি থেকে চার্টারে জাহাজ ভাড়া নেয়।

বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি। এ প্রণালি মধ্যপ্রাচ্যের পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে। কৌশলগত ভাবে সংবেদনশীল এ জলপথকে বিশ্ব অর্থনীতির লাইফলাইন বলা হয়। বিশ্বের মোট ব্যবহৃত তেলের প্রায় এক চতুর্থাংশ, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) বড় অংশ হরমুজ প্রণালি হয়েই পরিবাহিত হয়। প্রধান রপ্তানিকারক সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, ইরাক এবং ইরানের মতো তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো এই জলপথ ব্যবহার করে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ করে। দৈনিক প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেলের মতো অপরিশোধিত তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়।

২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালায়। এর বিপরীতে ইসরাইয়েলসহ আশপাশের আরব দেশগুলোর বিভিন্ন স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালায় ইরান। যুদ্ধের মধ্যে ইরান এই প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করলে বিশ্ব বাজারে তেলের দামে প্রভাব পড়ে। এ জলপথ বন্ধ হওয়ার বাংলাদেশে জ্বালানি তেল, এলএনজি ও এলপিজি নিয়ে অস্থিরতা তৈরি হয়।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় ইআরএলের ক্রুড আমদানিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। বিশেষ করে বিএসসির চার্টারার প্রতিষ্ঠান আমেরিকান কোম্পানি হওয়াতে চলতি মাসে দুই লাখ ক্রুড পরিবহন আটকে যায়। এরমধ্যে ‘নর্ডিক পোলাক্স’ নামের একটি জাহাজ এক লাখ ক্রুড অয়েল লোড নিয়ে ৫ মার্চ থেকে সৌদি আরবের রাস তানুরা বন্দরে আটকা পড়েছে। অন্য পার্সেলে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবল দানা বন্দর থেকে ২১-২২ মার্চ, পরবর্তীতে সূচি পাল্টে ৩১ মার্চ এক লাখ টন ক্রুড লোড নেওয়ার কথা থাকলেও এর আগেই যুদ্ধ এলাকায় মালিকপক্ষের জাহাজ পাঠানোর অনীহার কারণে ‘ওমেরা গ্যালাক্সি’ নামের ট্যাংকার ভেসেলের যাত্রা বাতিল হয়। ফলে ক্রুড অয়েল সংকট তৈরি হয় ইস্টার্ন রিফাইনারিতে।

বিকল্প উপায়ে সৌদি আরব থেকে এক লাখ টন ক্রুড আনার পদক্ষেপ নেয় বিপিসি। তারই অংশ হিসেবে সৌদি আরবের রাস তানুরা থেকে পাইপলাইনে দিয়ে আসা ক্রুড অয়েল লোড করে ‘এমটি নিনেমিয়া’ নামের একটি ট্যাংকার জাহাজ। 

বৈশ্বিক জাহাজ ট্র্যাকিং সংস্থার তথ্য বলছে, ‘এমটি নিনেমিয়া’ জাহাজটি চায়নার জোশাল বন্দর থেকে ৮ এপ্রিল ইয়ানবু বন্দরের দিকে রওয়ানা দিয়েছে। মার্শাল আইল্যান্ডের পতাকাবাহী জাহাজটি ১৯ এপ্রিল সৌদি আরবের ইয়ানবু আল বাহর বন্দরে পৌঁছে। লোহিত সাগর থেকে ভারত মহাসাগর হয়ে সরাসরি বাংলাদেশে চলে আসবে জাহাজটি।