জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে চুক্তি করবে সরকার: মন্ত্রী

জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে চুক্তি করবে সরকার: মন্ত্রী

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৪ মে, ২০২৬ ১৮:৫৬

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, 'বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করেছে সরকার। ‘বাংলাদেশ অফশোর বিডিং রাউন্ড ২০২৬’ এর আওতায় মোট ২৬টি ব্লকে (১১টি অগভীর ও ১৫টি গভীর সমুদ্র) অনুসন্ধানের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর সঙ্গে এ সংক্রান্ত চুক্তি সরকার করবে।'

রোববার সচিবালয়ে ‘বাংলাদেশ অফশোর বিডিং রাউন্ড-২০২৬’ নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। 

মন্ত্রী বলেন, 'বিএনপি আমলের পর আর নতুন করে কোনো বিদেশি কোম্পানিকে এনে এভাবে জাতীয় বিডিং করা হয়নি। আমরা দেখেছি যে সমুদ্র বিজয় হয়েছে। তা নিয়ে অনেক লাফালাফি হয়েছে। কিন্তু সেখান থেকে যে আহরণ করতে হবে সেই ব্যবস্থা ভুলে গিয়েছিল।'

তিনি বলেন, 'এখনো মাটির নিচে কী আছে আমরা জানি না। তাই আমরা জনগণের কাছে ওয়াদাবদ্ধ ছিলাম যে আমরা ক্ষমতায় এলে আমাদের বাপেক্সকে আমরা শক্তিশালী করবো। যেহেতু বাপেক্সের গভীর সমুদ্রে এক্সপ্লোরেশন করার মতো এক্সপেরিয়েন্স নেই এবং যেসব জিনিস প্রয়োজন সেগুলোও নেই। সে জন্য বাপেক্সে আমরা বলেছি যে তোমরা এই বিডিংয়ে আসো। বিদেশি কোম্পানিদের সঙ্গে বিডিং জয়েন্ট ভেঞ্চার করতে বলে আসো, বাপেক্সকেও কিন্তু আমরা এর মধ্যে (নতুন বিডিং) রেখেছি।'

তিনি আরও বলেন, 'আমরা যে ওয়াদাবদ্ধ হয়েছিলাম আমরা ১৮০ দিন শেষ হওয়ার আগেই কিন্তু এই বিডিংয়ে গেছি। আমরা আশা করি এই বিডিংয়ের পরে আমরা দেশের আইন-কানুন মেনে এবং দেশের স্বার্থ রক্ষা করে আমরা এই বিডিংয়ে যারা পাবে, তাদের কাছে হস্তান্তর করতে পারবো। ভবিষ্যতে যদি আমাদের এখান থেকে গ্যাস বা তেল যেটাই উত্তোলন করা যায়, সেটা দেশের উন্নয়নের জন্য একটা বড় নিয়ামক হয়ে দাঁড়াবে।'

বর্তমান সরকার দায়িত্ব নিয়ে জ্বালানিখাত বেহাল অবস্থায় পেয়েছে দাবি করে ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, 'আমরা সেটাকে নজরে নিয়েই আমাদের দেশের জ্বালানির একটা এনার্জি সিকিউরিটি যেটা করা লাগে, সেটার জন্য আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি এবং এখন আমরা আগের থেকে অনেক ভালো অবস্থায় আছি।'

তিনি বলেন, 'বিএনপি সবসময় তাদের মূল যে জাতীয়তাবাদ, সেই জাতীয়তাবাদকেই সামনে রেখে আমরা আমাদের এই বিডিং করছি যাতে আমার দেশের কোনো রকমের কোনো ক্ষতি না হয়। কোনো কিছুর বিনিময়ে যেন না করি আর কী। তবে আন্তর্জাতিক ভাবে উত্তোলনের যেসব কন্ট্রাক্ট আছে সেগুলোকে বিশ্লেষণ করেই আমাদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে আমরা এই কন্ট্রাক্টগুলো করবো। আশা করি ইনশাল্লাহ আমরা কামিয়াব হবো।'

বিদেশি কোম্পানিগুলো কেন এবার বিডে আসবে- জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, 'যারা বিড করবে, তারা অপরচুনিটিটা খুঁজবে। যেহেতু আমরা একটা নির্বাচিত সরকার এবং আমাদের যে ইলেকশনটা হয়েছে, সেই ইলেকশন নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। সুতরাং একটা পিপল ম্যান্ডেট নিয়ে আমরা এই সরকারে এসেছি। সেটাও আমাদের এই ইনভেস্টরদের জন্য একটা বড় আস্থার জায়গা। আমরা জবাবদিহি নিশ্চিত করেছি। এসব দেখে আমার কাছে তাদের সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে, তাদের আস্থার জায়গায় তারা ফেরত এসেছে এবং তারা বিডে আসবে।'

রাষ্ট্রীয় স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে কোনো শঙ্কা আছে কি না? এ প্রশ্নে তিনি বলেন, 'উই আর ভেরি ট্রান্সপারেন্ট এবং আমরা আমাদের দেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে কিছু বলবো না। এটা আমাদের কমিটমেন্ট, সেটাই আমরা জানিয়ে দিয়েছি।'

কোনো বিদেশি কোম্পানি বিডে অংশ নিতে যোগাযোগ করেছে কি না, তাদের আগ্রহ আছে কি না? অথবা এই সমুদ্রে কোনো জিওপলিটিক্যাল ইস্যু আছে কি না? এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে মন্ত্রী বলেন, 'ভবিষ্যতে কী হবে আমি কিছু বলতে পারবো না, সেটা একমাত্র আল্লাহ জানেন। আর দুই নম্বর হলো যে, যারা এটা করবে অনেকেই আমার সঙ্গে দেখা করে গেছে, বলে গেছে দে আর ইন্টারেস্টেড। পার্টিকুলারলি বড় বড় কোম্পানিগুলো, আমেরিকান কোম্পানিগুলো আছে এবং চাইনিজরাও ইন্টারেস্টেড এই ব্যাপারে দেখলাম। তো আমি আশা করি যে এবার অতীতে কী হয়েছে সেটা হবে না, এবার বিডিংয়ে লোকজন আসবে।'

আপনার এই পিএসসিতে এমন কী চমক আছে যাতে দেশের স্বার্থ রক্ষা হবে এবং বিদেশি কোম্পানি অনুসন্ধানে আগ্রহ দেখাবে? এ বিষয়ে তিনি বলেন, 'চমক হলো বিএনপি সরকার।'

কোনো কোম্পানি যদি সবগুলো ব্লক চায়, দেওয়া হবে কি না? এ বিষয়ে ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, 'আগে চেয়ে নিক, তারপর চিন্তা করবো।'

এবার বিডিংয়ের ক্ষেত্রে কি রপ্তানির সুযোগ রাখা হচ্ছে- জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'রপ্তানি তখনই করতে পারবো যখন আমার ডিমান্ড ফুলফিল হবে। আমি না খেয়ে অন্যকে খাওয়াবো না। এইটুকুই দেশের স্বার্থে থাকবে।'

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ‘বাংলাদেশ অবশোর বিডিং রাউন্ড-২০২৪’ এর আওতায় গভীর সমুদ্রের ১৫টি এবং অগভীর সমুদ্রে নয়টিসহ মোট ২৪টি ব্লকের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। সাতটি কোম্পানি বিড ডকুমেন্ট কিনলেও তারা কেউই বিড দাখিল করেনি।

এ জন্য বাংলাদেশের সমুদ্র এলাকায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে আরও উদার ও বিনিয়োগবান্ধব শর্ত রেখে ‘বাংলাদেশ অফশোর মডেল পিএসসি-২০২৬’ এবং ‘বাংলাদেশ অফশোর বিডিং রাউন্ড-২০২৬’ করেছে সরকার। নতুন মডেলে আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলোর জন্য শতভাগ কস্ট রিকভারি, ব্রেন্ট ক্রুডভিত্তিক গ্যাস মূল্য নির্ধারণ, তৃতীয় পক্ষের কাছে গ্যাস বিক্রি ও নির্দিষ্ট শর্তে রপ্তানির সুযোগসহ নানা সুবিধা রাখা হয়েছে। একইসঙ্গে ২৬টি অফশোর ব্লক আন্তর্জাতিক দরপত্রের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে।  

নতুন পিএসসি অনুযায়ী, মোট অনুসন্ধান মেয়াদ ধরা হয়েছে ৯ বছর। এর মধ্যে প্রাথমিক মেয়াদ ৬ বছর এবং পরবর্তী মেয়াদ ৩ বছর। ন্যূনতম কর্ম বাধ্যবাধকতা হিসেবে শুধু সিসমিক জরিপ রাখা হয়েছে। এছাড়া টু-ডি ও থ্রি-ডি সিসমিক জরিপ এবং ড্রিলিং কার্যক্রম বিডযোগ্য করা হয়েছে।  

অনুসন্ধান সময়ের বিভিন্ন পর্যায়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ ব্যাংক গ্যারান্টির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। অগভীর ও গভীর সমুদ্রের উভয় ব্লকের ক্ষেত্রে শতভাগ কস্ট রিকভারি এবং বার্ষিক সর্বোচ্চ ৭৫ শতাংশ সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। একইসঙ্গে আর-ফ্যাক্টরভিত্তিক লাভ ভাগাভাগি পদ্ধতি চালু করা হয়েছে।

অগভীর সমুদ্র ব্লকগুলোতে বাপেক্সের জন্য ১০ শতাংশ ক্যারিড ইন্টারেস্ট রাখা হয়েছে। অনুসন্ধান, উন্নয়ন ও উৎপাদন পর্যায়ে আমদানিকৃত যন্ত্রপাতিতে শুল্কমুক্ত সুবিধাও দেওয়া হবে। কন্ট্রাক্টরের আয়কর বহন করবে পেট্রোবাংলা। 

গ্যাসের মূল্য আন্তর্জাতিক ব্রেন্ট ক্রুডের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে। মূল্য নির্ধারণে মার্কার প্রাইস হিসেবে ব্রেন্টকে ভিত্তি ধরে অগভীর সমুদ্রের জন্য ১০ দশমিক ৫ শতাংশ এবং গভীর সমুদ্রের জন্য ১১ শতাংশ হার নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ফ্লোর ও সিলিং মূল্য নির্ধারণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে, যা গত পাঁচ বছরের ব্রেন্ট মূল্যের সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গড়ের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে।  

নতুন মডেলে কন্ট্রাক্টরদের তৃতীয় পক্ষের কাছে গ্যাস বিক্রি এবং নির্দিষ্ট শর্তে রপ্তানির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। পাইপলাইন বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে পারস্পরিক সম্মত ট্যারিফ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এছাড়া আইওসিগুলোর বিনিয়োগের যৌক্তিক মুনাফা নিশ্চিত করতে নির্মিত পাইপলাইনে পেট্রোলিয়াম পরিবহনের জন্য পেট্রোবাংলার মাধ্যমে ট্যারিফ প্রদানের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। ট্যারিফ নির্ধারণে দূরত্ব, পানির গভীরতা ও গ্যাসের পরিমাণ বিবেচনায় নেওয়া হবে।  

বিনিয়োগ সুরক্ষায় স্ট্যাবিলাইজেশন ও এক্সপ্রোপ্রিয়েশন সংক্রান্ত বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া কমার্সিয়াল ডিসকভারি, উৎপাদন, গবেষণা ও উন্নয়ন এবং সার্ভিস ফি সংক্রান্ত বিভিন্ন বোনাস ও ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রশিক্ষণ অনুদানের ব্যবস্থাও রয়েছে। 

গ্যাস ক্ষেত্রে উৎপাদন মেয়াদ ২৫ বছর এবং তেল ক্ষেত্রে ২০ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বাণিজ্যিক উৎপাদন অব্যাহত থাকলে অতিরিক্ত ১০ বছর মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ থাকবে।  

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়েছে, প্রতিটি ব্লকের জন্য পৃথক আবেদন করতে হবে। তবে গভীর সমুদ্র ব্লকের ক্ষেত্রে দুটি সংলগ্ন ব্লকের জন্য একক চুক্তির সুযোগ রাখা হয়েছে। বিডাররা একক ভাবে অথবা কনসোর্টিয়াম গঠন করে একাধিক ব্লকে অংশ নিতে পারবেন।  

অপারেটর হিসেবে অংশ নিতে অগভীর সমুদ্র ব্লকের জন্য দৈনিক ন্যূনতম ৫ হাজার ব্যারেল তেল বা ৭৫ এমএমএসসিএফ গ্যাস উৎপাদনের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। আর গভীর সমুদ্র ব্লকের জন্য দৈনিক ১০ হাজার ব্যারেল তেল বা ১০০ এমএমএসসিএফ গ্যাস উৎপাদনের অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক অনুসন্ধান ও উৎপাদন কার্যক্রমে অভিজ্ঞতাও থাকতে হবে। 

সাশ্রয়ী মূল্যে ইনফরমেশন ও প্রমোশনাল ডাটা প্যাকেজ কেনার সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে বিড জমা দিতে হলে প্রমোশনাল বা বিড ডকুমেন্ট প্যাকেজ কেনা বাধ্যতামূলক। একটি প্যাকেজ কিনেই একাধিক ব্লকে অংশ নেওয়া যাবে। বিড জমা দেওয়ার শেষ তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী ৩০ নভেম্বর।  

সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামসহ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ কর্পোরেশনের (পেট্রোবাংলা) শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।