ক্যাপাসিটি চার্জ ইস্যুতে আইনি পদক্ষেপের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে: মন্ত্রী

ক্যাপাসিটি চার্জ ইস্যুতে আইনি পদক্ষেপের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে: মন্ত্রী
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১২ জুন, ২০২৬ ২১:১০

আপডেট: ১২ জুন, ২০২৬ ২১:১০

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, 'বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ক্যাপাসিটি চার্জ ইস্যুতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত চাওয়া হয়েছে। অনুকূল মতামত পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।'

শুক্রবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

তবে কাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হবে, কিংবা কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলেননি ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।

বিদ্যুৎখাতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার চুক্তিগুলোতে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ প্রধান্য পেয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। এসব চুক্তির কারণে বড় ধরনের ‘আর্থিক ও আইনি জটিলতার’ মুখে পড়ার কথাও বলেন তিনি।

মন্ত্রী বলেন, 'দেশের বিদ্যুৎখাতে ক্যাপাসিটি চার্জ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল একটা সবুজ সংকেত হিসেবে, যেন বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা সহজে ব্যাংক ঋণ পেতে পারেন। আগের চুক্তিগুলো ওই সরকার…মানে চুরি করার জন্য যেটা করেছিল, চুক্তিগুলো সব বিনিয়োগকারীর পক্ষে করেছে, সরকারের পক্ষে কিছু নাই।'

নিজে মন্ত্রীর চেয়ারে বসার পর থেকেই ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়ে কাজ শুরু করেন বলে দাবি করেন তিনি। 

মন্ত্রী বলেন, 'আমি প্রথম দিনই ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়ে বসেছিলাম। চীনা বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনা করেছিলাম। তারা জানিয়েছেন, হঠাৎ করে ক্যাপাসিটি চার্জ বন্ধ করে দিলে তাদের অর্থায়নকারী ব্যাংকগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা করাও সম্ভব হবে না।'

২০০৯ সালে দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ৬ হাজার মেগাওয়াটেরও কম। ওই বছর ক্ষমতায় এসে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনকে সামনে রেখে দায়মুক্তি আইন (ইনডেমনিটি আইন) প্রণয়ন করে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার। তখন দরপত্র ছাড়াই শতাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়, যার বেশির ভাগই ছিল বেসরকারি বিনিয়োগে। 

বিদ্যুৎ কেনার চুক্তিতে ক্যাপাসিটি চার্জ চালুর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের জন্য সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ পর্যন্ত মুনাফার সুযোগ রাখা হয়। ফলে কেন্দ্রগুলো উৎপাদনে থাকুক বা না থাকুক, বিনিয়োগকারীরা তাদের পাওনা ঠিকই পেতে থাকেন। শুধু শীতে নয়, গরমের সময়ও কম চাহিদার কারণে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র অলস পড়ে থাকে। এ জন্য বসিয়ে রেখেও কেন্দ্রগুলোকে অর্থ দিতে হয়।

আবার রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মতো বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটের সময় চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস ও তেল আমদানি না হওয়ায় অনেক কেন্দ্র ব্যবহার না হয়ে অলস বসে থাকে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দীর্ঘদিন স্থবির থাকার কারণেও অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র মাসের পর মাস সক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদনে যেতে পারেনি। ওই সময়ের পর থেকে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দ্রুত কমতে থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। বিদেশি মুদ্রার সংকটে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি কেনার সক্ষমতা কমে যায়। 

অনেকের চোখে, অর্থপাচার এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) আমদানির ব্যয় মেটাতে গিয়েই রিজার্ভ কমে যেতে থাকে। আরেকটি বিষয় হলো, ক্যাপাসিটি চার্জের বেশির ভাগ অর্থও সরকারকে ডলারে পরিশোধ করতে হয়েছে।

২০০৯ সালের পর থেকে পরের ১৪ বছরে সরকারি ভাবে সংসদে উপস্থাপিত হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হয়। এখনো অনেক অর্থ বকেয়া রয়েছে। তবে জোর করে ক্যাপাসিটি চার্জ বন্ধ করে দিলে বিদ্যুৎ সরবরাহে সংকট তৈরি হবে বলে মনে করেন টুকু।

বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, 'দেশের যে পাওয়ার স্টেশনগুলো, সেগুলোর কোনো মেরামতও করে নাই, মেইন্টেনেন্সও করে নাই; বসিয়ে রেখেছে। সব পাওয়ার ক্রয় করা হয়েছে প্রাইভেট পাওয়ার থেকে। এর ফলে বিদ্যুৎখাতে প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকার বকেয়া তৈরি হয়েছে।'

আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম ও অপচয় হয়েছে মন্তব্য করে মন্ত্রী বলেন, 'পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড ৫ লাখ ডিজিটাল মিটার কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এর মধ্যে ২ লাখ ৫০ হাজার মিটার দেশে আনা হলেও তিন বছরে মাত্র ৬৫টি মিটার চালু করা সম্ভব হয়েছে। বাকিগুলো গুদামে পড়ে রয়েছে। বাকি ২ লাখ ৫০ হাজার মিটার সরবরাহ বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়ার পর দেখা যায়, আগেই সরবরাহকারীর কাছে জাহাজীকরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এখন যদি এটাকে ক্যান্সেল করি, সে কোর্টে গেলে জিতে যাবে। তো এই পদ্ধতিতে দেশ থেকে টাকা বের করে নিয়ে চলে গেছে।'

ডিপিডিসির আন্ডারগ্রাউন্ড ক্যাবল প্রকল্প নিয়েও সমালোচনা করেন তিনি।

জ্বালানি মন্ত্রী বলেন, '২০৪০ সাল পর্যন্ত উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ৬৫টি সাব স্টেশন নির্মাণের কথা ছিল। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে মাত্র ৩৮টি সাব স্টেশনের কাজ সম্পন্ন হয়েছে।'

সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন, কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি ও গভর্নর মোস্তাকুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।