বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিড দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ উৎপাদন খরচ, বিশাল ভর্তুকির বোঝা এবং গ্রামাঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের অভাবের মতো সমস্যাগুলোর সঙ্গে লড়াই করছে। তবে সম্প্রতি ঘোষিত বাজেটে সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম আমদানির ওপর ব্যাপক শুল্ক ছাড় দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং ব্যবহারের ধরনে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
নতুন বাজেটে সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, লিথিয়াম ব্যাটারি, কেবল এবং মাউন্টিং কাঠামোর ওপর থেকে আমদানি শুল্ক পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হয়েছে। এর ফলে কার্যকর শুল্কের হার প্রায় ২০ শতাংশ থেকে শূন্যে নেমে এসেছে। বিশেষ করে ব্যাটারি স্টোরেজের শুল্ক ৬১.৮ শতাংশ থেকে সরাসরি শূন্য করা হয়েছে। পাশাপাশি বাণিজ্যিক সৌর বিনিয়োগকারীদের ২০৩৫ সাল পর্যন্ত আয়কর মওকুফের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, বাসাবাড়িতে সোলার সিস্টেম স্থাপন করলে গ্রাহকরা বিদ্যুৎ বিলে ৫ শতাংশ ছাড় পাবেন—যার মূল উদ্দেশ্য হলো গ্রিডের ওপর থেকে বিদ্যুতের চাপ কমানো।
খরচ কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে
এই পদক্ষেপগুলো সামগ্রিক বিদ্যুৎ খাতের জন্য কেন এতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা একটি সাধারণ হিসাবেই স্পষ্ট। বর্তমানে শিল্পখাতে অফ-পিক আওয়ারে গ্রিড বিদ্যুতের দাম ইউনিটপ্রতি ১১.৫৬ টাকা, যা পিক আওয়ারে ১৬ টাকা পর্যন্ত ওঠে। নতুন শুল্কমুক্ত সুবিধায়, ২০ বছরের প্যানেল মেয়াদে রুফটপ বা ছাদে স্থাপিত সোলার সিস্টেম থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের খরচ পড়বে ইউনিটপ্রতি মাত্র ৩ টাকার কাছাকাছি। এটি গ্রিড বিদ্যুতের বর্তমান মূল্যের প্রায় এক-চতুর্থাংশ।
সোলার প্যানেল স্থাপনের খরচও আগের তুলনায় অনেক কমেছে। এক মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি রুফটপ সোলার সিস্টেম বসাতে আগে ৩.৫ থেকে ৪ কোটি টাকা লাগতো, যা এখন ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমে ২.৭৫ থেকে ৩ কোটি টাকায় নেমে আসবে। একইভাবে ব্যাটারির দামও কমেছে—এক কিলোওয়াট-আওয়ার লিথিয়াম ব্যাটারির দাম প্রায় ৩০০ ডলার থেকে কমে ১৬০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। একটি এক মেগাওয়াট প্রকল্পে বিদেশি মুদ্রার ব্যয় কমবে প্রায় ৪০ হাজার ডলার (প্রায় ৫০ লাখ টাকা), যা নবায়নযোগ্য জ্বালানি যন্ত্রপাতি আমদানির ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাবে।
ভর্তুকি ও আমদানি ব্যয় সাশ্রয়
এই পরিবর্তন বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের অন্যতম বড় একটি বোঝা—ভর্তুকির চাপ—কমাতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে শিল্পখাতে ৪,০০০ মেগাওয়াট রুফটপ সোলার স্থাপন করা সম্ভব। এটি বাস্তবায়িত হলে গ্রিড নির্ভরতা একই হারে কমে আসবে, যার ফলে সরকার বছরে প্রায় ৫,০০০ কোটি টাকা ভর্তুকি বাঁচাতে পারবে (বর্তমানে প্রতি ইউনিটে ৪ থেকে ৬ টাকা ভর্তুকি দেওয়া হয়)।
গ্রিডের ওপর নির্ভরতা কমলে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয়ও হবে। প্রতি ৫০০ মেগাওয়াট রুফটপ সোলার স্থাপন করা হলে জ্বালানি আমদানি ব্যয় প্রায় ২ কোটি ডলার সাশ্রয় হবে, যা ১,০০০ মেগাওয়াটের ক্ষেত্রে দ্বিগুণ হতে পারে।
পাকিস্তান ও ভিয়েতনামের সফল দৃষ্টান্ত
জ্বালানি সংকটের মুখে দ্রুত সৌরবিদ্যুতের প্রসারে এই অঞ্চলের দুটি দেশের উদাহরণ প্রাসঙ্গিক। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর পাকিস্তানে জীবাশ্ম জ্বালানির দাম সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যায়। বাধ্য হয়ে সরকার সৌর যন্ত্রপাতির ওপর থেকে আমদানি শুল্ক তুলে নেয়। এর প্রভাবে ২০২০ সালে তাদের জাতীয় গ্রিডে সৌরবিদ্যুতের অংশ যেখানে মাত্র ২.৯ শতাংশ ছিল, ২০২৫ সালে তা বেড়ে ৩২.৩ শতাংশে দাঁড়ায়। পাকিস্তানে এখন রুফটপ সোলারের ধারণক্ষমতা প্রায় ৩৪ হাজার মেগাওয়াট। দেশটির চারভাগের একভাগ পরিবার এখন কোনো না কোনোভাবে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করছে, যা তাদের জ্বালানি আমদানিতে কোটি কোটি ডলার বাঁচাচ্ছে।
একই পথে হেঁটেছে ভিয়েতনাম। ২০১৮ সালে দেশটিতে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন প্রায় শূন্য থাকলেও, গ্রিড বিদ্যুতের উচ্চমূল্য এবং আকর্ষণীয় ট্যারিফ সুবিধার কারণে ২০২৫ সালের শেষে তা ১৯ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে। ভিয়েতনাম এখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে বড় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশ।
বাংলাদেশ সরকারের লক্ষ্য আগামী পাঁচ বছরে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা। এর মধ্যে ৪,০০০ মেগাওয়াট আসবে শিল্প প্রতিষ্ঠানের ছাদ থেকে, আর বাকি ৬,০০০ মেগাওয়াট আসবে গ্রাউন্ড-মাউন্টেড বা ইউটিলিটি-স্কেল প্রকল্প থেকে।
মান নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ
এই জ্বালানি রূপান্তরের পথে অন্যতম বড় ঝুঁকি হলো যন্ত্রপাতির গুণগত মান। শুল্ক উঠে যাওয়ায় বাজার এখন সব ধরনের সৌর যন্ত্রপাতির জন্য উন্মুক্ত। কিন্তু এর সবই যে মানসম্মত, তা বলা কঠিন। অন্যান্য দেশে দেখা গেছে, নিম্নমানের প্যানেল, নকল ব্যাটারি ও খারাপ ইনভার্টারের কারণে কয়েক বছরের মধ্যেই সোলার সিস্টেম অকেজো হয়ে পড়ে। এর ফলে সৌরশক্তির ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
তাই চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানির পর্যায়ে টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা) এবং বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)-এর কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। নজরদারি দুর্বল হলে পুরো বাজার নিম্নমানের পণ্যে ভরে যেতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য রুফটপ সোলার এখন অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত লাভজনক একটি বিকল্প, এবং এই সিদ্ধান্তটি এমন এক সময়ে নেওয়া হয়েছে যখন জ্বালানি সরবরাহ ও গ্রিড খরচের ওপর প্রচণ্ড চাপ রয়েছে। দেশ এই নীতিগত সিদ্ধান্তকে দীর্ঘস্থায়ী সফলতায় রূপ দিতে পারবে কি না, তা নির্ভর করবে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর ওপরে। তারা যদি মানসম্মত যন্ত্রপাতির প্রবেশ নিশ্চিত করতে পারে, তবে আগামী কয়েক দশক বাংলাদেশ সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ উপভোগ করতে পারবে।
আরো পড়ুন: