ইরান "পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত" অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী বন্ধ ঘোষণা করার পর বিশ্ব তেলের বাজারে বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রতিদিন বিশ্বের একটি বিশাল পরিমাণ তেল এই নৌপথ দিয়ে যাতায়াত করে। সম্প্রতি এই অঞ্চলে লড়াই অনেক বেড়ে যাওয়ার পর এই সিদ্ধান্ত নেয় তেহরান। একই সঙ্গে ইরান মালবাহী জাহাজ, মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং পারস্য উপসাগরের প্রতিবেশী দেশগুলোকে লক্ষ্য করে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
গত শনিবার ইরানের ভেতরে প্রায় ১৪০টি জায়গায় মার্কিন সামরিক বাহিনী বড় ধরনের বিমান হামলা চালালে পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হয়ে যায়। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, একটি মালবাহী জাহাজে ইরানের আগের হামলার জবাবে এই পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আমেরিকার এই হামলায় মূলত ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ঘাঁটি, নৌঘাঁটি এবং গোলাবারুদের গুদামগুলো ধ্বংস করার ওপর জোর দেওয়া হয়।
এই হামলার পর মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে জানান, ইরান একটি ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং তাদের এই কাজের জন্য এখন "চড়া মূল্য দিতে হবে।"
জবাবে ইরান দ্রুত এই অঞ্চলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল সরবরাহের পথটি আটকে দেয়, যার ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম সাথে সাথেই অনেক বেড়ে যায়। ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস দাবি করেছে, সঠিক পথ মেনে না চলায় তারা একটি জাহাজে "সতর্কতামূলক গুলি" ছুঁড়েছিল। তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, হামলার পর জাহাজটির ইঞ্জিন রুমে আগুন ধরে যায় এবং সেটি অচল হয়ে পড়ে।
ইরানি বাহিনী এই এলাকায় আরও একটি মালবাহী জাহাজে আঘাত করার কথা জানিয়েছে। ভারতীয় কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে, ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজ থেকে লাইফবোটের সাহায্যে দশজন ভারতীয় নাগরিককে উদ্ধার করা গেলেও ওমান উপকূলে এখনও একজন ভারতীয় নাবিক নিখোঁজ রয়েছেন।
এই সংঘাত এখন দ্রুত পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়েছে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোকে চরম সতর্ক অবস্থায় রেখেছে। ইরানি বাহিনী দাবি করেছে, তারা ওমানের দুকম বন্দরে অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর সাহায্য কেন্দ্র এবং যুদ্ধজাহাজের তেল সরবরাহ কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করে দিয়েছে। ওমান সরকার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে বৈঠক করার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এই হামলা চালানো হয়, যার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ওমান।
একই সময়ে কাতারে অবস্থিত একটি মার্কিন ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে হামলা চালায় ইরান। কাতারের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ক্ষেপণাস্ত্রের ভাঙা অংশের আঘাতে সেখানে তিনজন মানুষ আহত হয়েছেন। বাহরাইনে বিমান হামলার সাইরেন বেজে ওঠে এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েত তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করে ধেয়ে আসা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র গুলি করে নামায়। জর্ডানও জানিয়েছে, তাদের সীমানার ভেতর তিনটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র এসে পড়েছে, তবে এতে কেউ হতাহত হয়নি।
পরিস্থিতি একটি বড় যুদ্ধের দিকে চলে যাওয়ায় প্রতিবেশী দেশগুলো শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানাচ্ছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের প্রধান কূটনীতিক ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন এবং উভয় পক্ষকে যুদ্ধ থামিয়ে শান্ত থাকার অনুরোধ করেছেন।
তবে এই শান্তি চেষ্টার পরও পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ রয়ে গেছে। এই সহিংসতার মূল কারণ শুরু হয়েছিল গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি, যুদ্ধের প্রথম দিনে ইরানের আগের নেতা নিহত হওয়ার পর। ক্ষমতা নেওয়ার পর নিজের প্রথম লিখিত বিবৃতিতে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনেই স্পষ্ট ভাষায় প্রতিশোধ নেওয়ার কথা বলেছেন এবং এটিকে "আমাদের জাতির ইচ্ছা" বলে উল্লেখ করেছেন। গুরুত্বপূর্ণ এই তেলের পথটি এখন সম্পূর্ণ বন্ধ এবং কোনো পক্ষই পিছু হটতে রাজি না হওয়ায়, বিশ্ব জ্বালানি খাত এক বড় অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
আরো পড়ুন: