হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর ফলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে বাংলাদেশ আবারও বড় ঝুঁকির মুখে পড়বে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) সূত্রে জানা গেছে, রোববার পর্যন্ত ৪ লাখ ১৪ হাজার টন ডিজেল আছে। যা দিয়ে ৩৪ দিন চলবে। অকটেনও আছে ৪০ দিনের মতো।
বিপিসির আমদানি সূচি অনুযায়ী- এই মাসে আরও ৮-১০টি ডিজেলবাহী জাহাজ আসার কথা। যুদ্ধের পর ৩০ হাজার টনের পরিশোধিত ডিজেল কিনতে বিপিসিকে বিল দিতে হয়েছে ৪ কোটি ৫০ লাখ ডলারের মতো। কিন্তু এখন সেই বিল ৩ কোটি ২০ লাখ ডলারে নেমে এসেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকার টু সরকার (জি-টু-জি) প্রক্রিয়ায় ১৬ লাখ টন জ্বালানি তেল কেনার প্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত হয়ে আছে। এ ব্যাপারে সরবরাহকারী কোম্পানির সঙ্গে সমঝোতা শেষ হয়েছে। ওই সমঝোতা অনুযায়ী- উন্মুক্ত দরপত্রের চেয়ে ৭০০ কোটি টাকা কম প্রিমিয়ামে (জাহাজ ভাড়া) তেল সরবরাহ করতে রাজি হয়েছে ৪-৫টি কোম্পানি।
অন্যদিকে, দীর্ঘ মেয়াদি চুক্তির আওতায় গত মার্চ মাস থেকে কোনো কোম্পানি এলএনজি সরবরাহ করছে না। বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ কর্পোরেশন (পেট্রোবাংলা) স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনছে। এখন আগামী দিনে স্পট মার্কেট থেকেই এলএনজি কিনতে হবে বাংলাদেশকে।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) এ কে এম মিজানুর রহমান বলেন, 'হরমুজ বন্ধ থাকলে তেল এবং এলএনজির দাম বাড়বে। এটা বাংলাদেশের জন্য চিন্তার। গত মাসে যুদ্ধবিরতির কারণে এলএনজির দাম অনেক কমে এসেছিল। এখন বিশ্ব বাজারে এলএনজির দাম কী হয় সেটা দেখার বিষয়।'
প্রসঙ্গত, গত মার্চে স্পট মার্কেটে বাংলাদেশকে প্রতি ইউনিট এলএনজি ২৮ ডলার দিয়ে কিনতে হয়েছে। যুদ্ধবিরতির কারণে গত সপ্তাহ বাংলাদেশ সেই এলএনজি কিনেছে ১৬ থেকে ১৭ ডলারে। হরমুজ বন্ধ হওয়ার পর সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের বেচাকেনা শুরু হবে। তখন কী দামে তেল বিক্রি হয় সেটি দেখার বিষয়। গত শুক্রবার সর্বশেষ ব্র্যান্ড ক্রুড প্রতি ব্যারেল ৭৬ দশমিক ১০ ডলারে বিক্রি হয়েছে। মার্চ-এপ্রিলে যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে এটির দাম ১১৪ ডলারের বেশি উঠেছিল।
জি-টু-জির আওতায় ১৬ লাখ টন পরিশোধিত ডিজেল, অকটেন, ফার্নেস অয়েল এবং জেট ফুয়েল কেনার জন্য গত ২০ জুন সিঙ্গাপুরে ১০টি সরবরাহকারী কোম্পানির সঙ্গে সমঝোতা বৈঠক হয়েছিল। জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকের নিয়ম অনুযায়ী- ওই ১০ কোম্পানির সঙ্গে শুধু জাহাজ এবং অন্যান্য খরচ অর্থাৎ প্রিমিয়াম নিয়ে দর কষাকষি হয়েছে। সেই বৈঠকে ভারতের কোম্পানি আইওসিএল সর্বপ্রথম ১০ ডলারের নিচে অর্থাৎ ৯ দশমিক ৫ ডলার প্রিমিয়ামে তেল ডিজেল সরবরাহ করতে রাজি হয়। এরপর সেই দরে ইউনিপেক, পেট্রো চায়নাসহ কয়েকটি কোম্পানি তেল সরবরাহ করার নিশ্চয়তা দেয়। গত জুন থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত সরকার উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে চারটি কোম্পানির কাছ থেকে জ্বালানি তেল কিনছে। সেখানে প্রিমিয়াম দেওয়া হয়েছে সাড়ে ১৩ ডলারের বেশি।
ওই সমঝোতা বৈঠকে উপস্থিত একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সিঙ্গাপুরের বৈঠকে ১০ কোম্পানির মধ্যে ৯ কোম্পানি ১৪ ডলারের বেশি প্রিমিয়াম দাবি করেছিল। পরে ভারতের কোম্পানি কম প্রিমিয়ামে তেল দিতে রাজি হলে বাকিরাও একই প্রিমিয়ামে তেল দিতে রাজি হয়। যুদ্ধের কারণে তেল পরিবহনে এখন অনেক খরচ। এক সেন্ট কম প্রিমিয়াম মানে দেশের ৮২ লাখ টাকা সাশ্রয়। সেই হিসাবে ১৬ লাখ টনে এবার উন্মুক্ত দরপত্রের চেয়ে ৭০০ কোটি টাকা পরিবহন খরচ বা প্রিমিয়াম সাশ্রয় হয়েছে।
বিপিসি সূত্র জানিয়েছে, জি-টু-জি পদ্ধতিতে রোববার বিপিসি ওই ১৬ লাখ টন জ্বালানি তেল কেনার প্রস্তাব অনুমোদন হয়েছে। এখন এই প্রস্তাব ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এই ১৬ লাখ টন তেল কিনতে সরকারকে ১৮ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় করতে হতে পারে। তবে সব কিছু নির্ভর করছে আন্তর্জাতিক বাজার দর অনুযায়ী। বিপিসি তেল কিনে পালার্টস সিঙ্গাপুর দরের ফর্মুলা অনুযায়ী।
বিপিসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত চার মাসে তেলের ভতুর্কি হিসাবে সরকার এক টাকাও বিপিসিকে দেয়নি। সংস্থাটি ইস্টার্ন রিফাইনারি-২ প্রকল্প এবং অন্যান্য প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ করা টাকা তেল আমদানিতে খরচ করেছে। এতে করে বিপিসির হিসাব থেকে মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত ২১ হাজার কোটি টাকা তেল আমদানি করতে বেশি খরচ বা লোকসান দিতে হয়েছে। এ ব্যাপারে বিপিসি বার বার সরকারকে ভর্তুকি দিতে চিঠি দিলেও এখনো কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি অর্থ বিভাগ থেকে।
জ্বালানি বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে বলেছেন, গত মার্চে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এবার আগেভাগে ডিপোগুলোকে সতর্ক করা হয়েছে। জ্বালানি বিভাগ মনে করে, এবার তেল নিয়ে তেমন কোনো সমস্যা হবে না।
আরো পড়ুন: