বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের কোনো অভাব নেই বলে নিশ্চিত করেছে সরকার। দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল মজুত আছে, যা সাধারণ মানুষের আতঙ্ক ও গুজবের অবসান ঘটাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, জ্বালানি ব্যবহারের ওপর কোনো ধরনের বিধিনিষেধ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মতে, দেশে বর্তমানে প্রায় ৩ লাখ ৪৪ হাজার টন ডিজেল মজুত রয়েছে। যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি বা সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হলে তা সামাল দিতে এটি একটি বড় রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে।
বুধবার ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী জানান, সারা দেশে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে। তিনি মজুতের সঠিক পরিমাণ তুলে ধরে বলেন, দৈনন্দিন জীবনযাত্রা স্বাভাবিক রাখতে দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত আছে।
বর্তমান দৈনিক ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে মজুত করা জ্বালানি কতদিন চলবে, তার একটি সহজ হিসাব দেওয়া হয়েছে:
- ডিজেল: ৩১ দিন (মজুত আছে ৩ লাখ ৪৪ হাজার টন)
- অকটেন: ৩৬ দিন
- পেট্রোল: ২০ দিন
- ফার্নেস অয়েল: ২৫ দিন
- জেট ফুয়েল: ২০ দিন
মনির হোসেন চৌধুরী জানান, বছরের এই সময়ের তুলনায় বর্তমানে আমাদের কাছে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ডিজেলের মজুত রয়েছে। এর মানে হলো জুলাই ও আগস্ট মাসে দেশের কলকারখানা, পরিবহন ব্যবস্থা এবং বাসাবাড়িতে জ্বালানির কোনো অভাব হবে না। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ভিত্তিহীন গুজবে কান দিয়ে অযথা আতঙ্কিত না হতে সবার প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
ভবিষ্যতের জন্য বড় মজুত গড়ার পরিকল্পনা
সরকার শুধু বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েই ভাবছে না; তারা ভবিষ্যতের জন্যও বড় পরিকল্পনা করছে। হঠাৎ কোনো সমস্যা সমাধানের বদলে সরকার আরও নিরাপদ জ্বালানি মজুত গড়ে তোলার কাজ করছে। স্বল্পমেয়াদি লক্ষ্য হলো দেশের জ্বালানি মজুত সক্ষমতা ৬০ দিনে নিয়ে যাওয়া। আর দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী স্থায়ীভাবে ৯০ দিনের মজুত গড়ে তোলা, যা বিশ্বের বড় বড় দেশগুলো করে থাকে।
এই মজুত বাড়াতে এরই মধ্যে আরও জ্বালানি তেলের চালান দেশে আসছে। জুলাই মাসের শেষদিকে জাহাজে করে ১ লাখ ৪০ হাজার টন এবং আগস্ট মাসে আরও ২ লাখ ৪০ হাজার টন জ্বালানি আসার কথা রয়েছে।
তেলের মজুত বনাম গ্যাস সরবরাহ
ডিজেল ও পেট্রোলের মতো তরল জ্বালানির মজুত নিরাপদ হলেও দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে। মনির হোসেন চৌধুরী স্বীকার করেছেন যে, দেশে গ্যাসের চাহিদা এবং জোগানের মধ্যে বিশাল ব্যবধান রয়েছে।
প্রতিদিন দেশে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাসের প্রয়োজন। কিন্তু দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র এবং বিদেশ থেকে আমদানি করা তরল গ্যাস (এলএনজি) মিলিয়ে মোট সরবরাহ করা যাচ্ছে মাত্র ২ হাজার ৭০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।
এই ঘাটতির কারণে কলকারখানা, সার কারখানা এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বড় সমস্যায় পড়ছে। গ্যাস না থাকায় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে বাধ্য হয়ে দামি ফার্নেস অয়েল ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হচ্ছে।
গ্যাস সঙ্কট সমাধানে সরকারের উদ্যোগ
এই গ্যাস সঙ্কট সমাধানে সরকার প্রধানত দুটি সহজ পদক্ষেপ নিচ্ছে:
১. নতুন গ্যাস খোঁজা: দেশের ভেতরে স্থলে ও সমুদ্রে নতুন প্রাকৃতিক গ্যাস খোঁজার কাজ আরও বাড়ানো হয়েছে।
২. আমদানি ব্যবস্থা উন্নত করা: বিদেশ থেকে গ্যাস আনার জন্য মহেশখালী এবং কক্সবাজারে সমুদ্রে থাকা ভাসমান গ্যাস টার্মিনালগুলোর (এফএসআরইউ) আকার ও সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে। দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস লাইনে সমস্যা না করে বেশি পরিমাণ গ্যাস আমদানি করার জন্য এই টার্মিনালগুলো বড় করা অত্যন্ত জরুরি।
সার্বিকভাবে, তেল ও ডিজেল মজুতের এই খবরটি সাধারণ মানুষ এবং ব্যবসায়ীদের জন্য বেশ স্বস্তিদায়ক। তবে দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সাফল্য নির্ভর করবে সরকার কত দ্রুত এই চলমান গ্যাস সঙ্কটের সমাধান করতে পারে তার ওপর।
আরো পড়ুন: