বহুল আলোচিত নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে বৃহস্পতিবার (২০ নভেম্বর) রায় ঘোষণা করবেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। তবে আপিল বিভাগের রায়ে যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল হয়, তাহলে আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এই সরকার ব্যবস্থায় অনুষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা।
তাদের মতে, চতুর্দশ জাতীয় নির্বাচনই হতে পারে কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে।
এর আগে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে আপিল বিভাগ রায় দেওয়ার পর 'সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল' স্বয়ংক্রিয় ভাবে কার্যকর হয়। তেমনই, ১৯৮৮ সালে এরশাদ সরকারের আনা সংশোধনীতে বিভাগীয় শহরে স্থাপিত হাইকোর্টের সার্কিট বেঞ্চ হাইকোর্ট বাতিল করলে, সেই রায়ের পর সার্কিট বেঞ্চ স্বয়ংক্রিয় ভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরে এলেও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এই সরকার ব্যবস্থায় অনুষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ নেই। কারণ-
- কারণ সংসদ ভাঙার পর ১৫ দিনের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বিধান রয়েছে।
- আগের সংসদ ভেঙে গেছে এক বছরেরও বেশি সময় আগে।
- যেহেতু সংসদ নেই সেহেতু ভাঙার প্রশ্নই আসে না।
- তাই তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রয়োগের সাংবিধানিক সুযোগ নেই।
নির্বাচনের ক্ষেত্রে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রভাব-
রাজনৈতিক প্রভাব:
নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা: তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা হলে নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধি পেতে পারে, কারণ এটি একটি নিরপেক্ষ ও দল নিরপেক্ষ নির্বাচন প্রক্রিয়ার নিশ্চয়তা দেয়।
রাজনৈতিক মেরুকরণ: রাজনৈতিক দলগুলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন করতে রাজি হবে কি না তা একটি বড় প্রশ্ন। এটি রাজনৈতিক মেরুকরণকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
সাংবিধানিক জটিলতা: তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে সংবিধান সংশোধন করতে হবে, যা রাজনৈতিক সাংবিধানিক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
অর্থনৈতিক প্রভাব:
বিনিয়োগ: রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সুষ্ঠু নির্বাচন প্রক্রিয়ার উপর নির্ভর করে। বিনিয়োগের উপর ইতিবাচক বা নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
মুদ্রাস্ফীতি: তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে, কারণ এটি একটি নিরপেক্ষ অর্থনীতিতে ভারসাম্য বজায় রাখতে সক্ষম।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি: সুষ্ঠু নির্বাচন হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি পেতে পারে, কারণ এটি একটি স্থিতিশীল সরকার গঠনের সুযোগ তৈরি করে।
অন্যান্য প্রভাব:
আইনের শাসন: তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করতে পারে, কারণ এটি একটি নিরপেক্ষ ও দল নিরপেক্ষ নির্বাচন প্রক্রিয়ার নিশ্চয়তা দেয়।
নাগরিক অধিকার: তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নাগরিকদের অধিকার রক্ষায় সাহায্য করতে পারে, কারণ এটি একটি নিরপেক্ষ ও দলনিরপেক্ষ নির্বাচন প্রক্রিয়ার নিশ্চয়তা দেয়।
আপিল পক্ষের আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া বলেন, 'ওই সংশোধনীগুলো বাতিলের প্রেক্ষাপট ভিন্ন, বর্তমান প্রেক্ষাপটও তাই ভিন্ন।' তার ভাষ্য, 'ত্রয়োদশ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় করতে গেলে সাংবিধানিক জটিলতা তৈরি হতে পারে। ২০ নভেম্বরের রায়ে কেয়ারটেকার ব্যবস্থা ফিরে এলে চতুর্দশ নির্বাচন এ ব্যবস্থার অধীনে হতে পারে।'
২০১১ সালে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক তত্ত্বাবধায়ক সরকার সরকার ব্যবস্থা বাতিলের রায় দেন। গত বছরের ০৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এ রায় চ্যালেঞ্জ করে সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারসহ পাঁচ বিশিষ্ট নাগরিক রিভিউ আবেদন করেন। একই ইস্যুতে বিএনপি, দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জামায়াতে ইসলামী এবং আরও একজন পৃথক রিভিউ আবেদন করেন। শুনানি শেষে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে নতুন করে আপিল শুনানির সিদ্ধান্ত দেন আপিল বিভাগ।
১০ কার্যদিবস ধরে শুনানি শেষে গত ১১ নভেম্বর আপিলের ওপর চূড়ান্ত শুনানি শেষ হয়। এরপর প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চ ২০ নভেম্বর রায়ের দিন ধার্য করেন। বদিউল আলমের পক্ষে শুনানি করেন ড. শরীফ ভূঁইয়া; বিএনপির পক্ষে ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল; মির্জা ফখরুলের পক্ষে ব্যারিস্টার জয়নুল আবেদীন এবং জামায়াতের পক্ষে মোহাম্মদ শিশির মনির।
ড. শরীফ ভূঁইয়া বলেন, 'আমরা এখন যে অবস্থায় আছি সাংবিধানিক ভাবে সেটা কার্যকর করা সম্ভব নয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরে এলেও এবার, অর্থাৎ ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন এ ব্যবস্থায় করার সুযোগ নেই। কারণ সংসদ ভাঙার পর ১৫ দিনের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বিধান থাকলেও সংসদ ভেঙে গেছে এক বছরেরও বেশি সময় আগে।'
একই মত দেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল এবং জামায়াতের আইনজীবী শিশির মনির।
আদালতের নির্দেশনা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অ্যাডভোকেট শরীফ ভূঁইয়া বলেন, 'কনফিউশন এড়াতে আদালত বিষয়টি পর্যবেক্ষণ দিয়ে স্পষ্ট করে দিতে পারে। না হলে রায়ের ভিন্ন ব্যাখ্যা থেকে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। আদালত ব্যাখ্যা না দিলেও ব্যাখ্যা এটাই দাঁড়ায়- এ নির্বাচনে কেয়ারটেকার সম্ভব নয়।'
তিনি বলেন, 'বিচারপতি খায়রুল হক অবসরে যাওয়ার পর যে রায় দিয়েছেন সেটি অবৈধ- এ প্রশ্নও এসেছে। আমরা বলেছি, বিচারকদের ওপর কাজের চাপ অনেক। হঠাৎ এমন সিদ্ধান্ত দিলে জটিলতা তৈরি হতে পারে। এ বিষয়টি নিষ্পত্তি না করলেও চলবে।'
বিএনপির আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, 'আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্যে যে নির্বাচন, তা তত্ত্বাবধায়কের অধীনে হবে না। আদালতে আমরা বলেছি, পরবর্তী নির্বাচন থেকে এ বিধান কার্যকর হতে পারে।'
জামায়াতের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনিরও বলেন, 'তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরলেও ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনেই হবে। সংসদ ভাঙার ১৫ দিনের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বিধান ছিল। সংসদ না থাকলে ভাঙার প্রশ্নই আসে না। এখন তো সে রকম পরিস্থিতি নেই। আর সংসদ ভেঙেছে এক বছরেরও বেশি সময় আগে। ফলে এখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রয়োগের সাংবিধানিক সুযোগ নেই।'
তার মতে, বর্তমানে দেশ একটি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। তাদের তিনটি ম্যান্ডেট- বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন। সেই ধারাবাহিকতায়ই আসন্ন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নতুন সংসদ গঠনের পর চাইলে আগের তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতি পুনর্বহাল করা যেতে পারে অথবা জুলাই সনদের মেকানিজম অনুযায়ী নতুন কাঠামো গড়া যেতে পারে।
শিশির মনির বলেন, 'আমরা চাই আদালতের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা ফিরে আসুক। তবে কোনো পর্যবেক্ষণ নয়। কারণ বর্তমানে কার্যকর আইন ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নেই।'
অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, 'বিচারপতি খায়রুল হকের দেওয়া রায় থাকা উচিত নয়, কারণ তা একটি রাজনৈতিক দলকে সুবিধা দিতে লেখা হয়েছিল। এটি বর্তমান সরকারের পর যে সরকার আসবে, সেখান থেকে কার্যকর হলে আইনের ব্যত্যয় হবে না।'
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের আন্দোলনের চাপে তৎকালীন বিএনপি সরকার ত্রয়োদশ সংশোধনী পাস করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু করে। পরে ১৯৯৮ সালে এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট হয়। ২০০৪ সালে রিট খারিজ হলে ব্যবস্থা বহাল থাকে।
২০০৫ সালে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হয়। ২০০৬ সালের রাজনৈতিক সংকট ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছর ক্ষমতায় থাকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এরপর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরলে ২০১০ সালের ০১ মার্চ আপিল বিভাগে শুনানি শুরু হয়। অ্যামিকাস কিউরিসহ সবাই কেয়ারটেকার ব্যবস্থার পক্ষে মত দেন। তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমও এর পক্ষে ছিলেন।
২০১১ সালের ১০ মে সাত বিচারপতির আপিল বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতে ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করে। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের আগেই ২০১১ সালের ৩০ জুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিলুপ্তিসহ ৫৫টি সংশোধনীসহ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী জাতীয় সংসদে পাস হয় এবং ৩ জুলাই তা অনুমোদন পায়।
গত ১৭ ডিসেম্বর বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর হাইকোর্ট বেঞ্চ পঞ্চদশ সংশোধনীর ২০ ও ২১ ধারা সংবিধানবিরোধী ও বাতিল ঘোষণা করে রায় দেন। ফলে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফেরার পথ তৈরি হয়।
২০১১ সালের ১০ মে সাত বিচারপতির আপিল বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতে ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করেন। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের আগেই ২০১১ সালের ৩০ জুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিলুপ্তি ও ৫৫টি সংশোধনীসহ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী জাতীয় সংসদে পাস হয় এবং ০৩ জুলাই তা অনুমোদন পায়।
আরো পড়ুন: