তরুণদের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষা ব্যবস্থার রূপান্তরের আহ্বান প্রধান উপদেষ্টার

তরুণদের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষা ব্যবস্থার রূপান্তরের আহ্বান প্রধান উপদেষ্টার
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস মঙ্গলবার রাজধানীর একটি হোটেলে ‘দক্ষিণ এশিয়ার উচ্চশিক্ষার বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পথনির্দেশনা’ শীর্ষক আঞ্চলিক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন। ছবি: পিআইডি

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৩ জানুয়ারি, ২০২৬ ২১:০৬

যুবসমাজের প্রত্যাশা, চিন্তাভাবনা ও আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে নতুনভাবে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। একই সঙ্গে তিনি দক্ষিণ এশিয়ায় উচ্চশিক্ষা খাতে সহযোগিতা জোরদারে আঞ্চলিক জোট সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন।

মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর একটি হোটেলে তিন দিনব্যাপী দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সম্মেলন ‘দক্ষিণ এশিয়ার উচ্চশিক্ষার বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পথনির্দেশনা (সার্চে–২০২৬)’–এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

অধ্যাপক ইউনূস বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকায় ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো, বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান, শিক্ষা ব্যবস্থার প্রকৃত উদ্দেশ্য নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে। তাঁর মতে, বিশ্ববিদ্যালয় ও সামগ্রিক শিক্ষার লক্ষ্য কী হওয়া উচিত— তা বোঝার জন্য এই অভিজ্ঞতাগুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি।

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তত্ত্বাবধানে এবং বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়িত হায়ার এডুকেশন অ্যাকসেলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন (হিট) প্রকল্পের আওতায় এই সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। এতে যুক্তরাজ্য, মালদ্বীপ, মালয়েশিয়া, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কাসহ বিভিন্ন দেশের আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে শিক্ষার্থীদের ভূমিকার কথা তুলে ধরে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, তরুণরা কোনো হঠাৎ আবেগে রাস্তায় নামেনি। তাদের নিজস্ব চিন্তা, যুক্তি ও রাজনৈতিক সচেতনতা রয়েছে। কেন তারা অস্ত্রের মুখে দাঁড়িয়ে জীবন উৎসর্গ করেছিল— সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ব্যর্থ হলে রাষ্ট্র একটি বড় সুযোগ হারাবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি শহীদ স্কুলছাত্র শাহরিয়ার খান আনাসের মায়ের কাছে লেখা একটি চিঠির কথা উল্লেখ করেন, যেখানে আনাস বন্ধুদের সঙ্গে রাজপথে নামাকে নিজের দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করেছিল। অধ্যাপক ইউনূস বলেন, এই চিঠি তরুণদের মনোজগত ও দায়বদ্ধতার একটি শক্তিশালী উদাহরণ।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ঢাকার ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। শ্রীলঙ্কা ও নেপালেও রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা গেছে, তবে বাংলাদেশে তা আরও বিস্তৃত ও গভীর রূপ নিয়েছে। তিনি বলেন, আঞ্চলিক সহযোগিতার এই উদ্যোগ মূলত সার্কের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। অথচ বাস্তবে এই আঞ্চলিক জোট আজ প্রায় নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রয়েছে।

তিনি বলেন, সার্কের মূল দর্শন ছিল পারস্পরিক বিনিময় ও একে অপরের কাছ থেকে শেখা। প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার আহ্বান জানিয়ে আসছেন এবং ভবিষ্যতেও এই দাবি অব্যাহত রাখবেন বলে জানান।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটের প্রসঙ্গ টেনে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, গণঅভ্যুত্থান দেশের পুরোনো কাঠামো ভেঙে দিয়েছে। তরুণরা নিজেদের মতো করে ‘জুলাই সনদ’ তৈরি করেছে এবং তারা মনে করে, দেশের বহু সমস্যার মূল নিহিত রয়েছে সংবিধানে। সে কারণেই ভবিষ্যৎ সংবিধান নির্ধারণে গণভোটের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে তিনি ব্যাখ্যা করেন।

এই প্রেক্ষাপটে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, এসব বিষয় শ্রেণিকক্ষে পড়ানো হয় না, অথচ তরুণরা ইতোমধ্যে রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তুলেছে। ভবিষ্যতে তাদের কেউ কেউ সংসদ সদস্য হতে পারে, এমনকি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বও নিতে পারে।

শিক্ষা ব্যবস্থার সমালোচনা করে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, বর্তমান শিক্ষা কাঠামো মৌলিকভাবে চাকরিকেন্দ্রিক, যা তিনি একটি ভ্রান্ত ধারণা বলে মনে করেন। তাঁর মতে, শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল চাকরির জন্য মানুষ তৈরি করা নয়। মানুষ জন্মগতভাবেই সৃজনশীল, আর সেই সৃজনশীলতাই মানবসভ্যতার প্রধান শক্তি।

তিনি বলেন, চাকরিকেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা সৃজনশীল মানুষকে নির্ভরশীল করে তোলে। এর পরিবর্তে শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য হওয়া উচিত তরুণদের উদ্যোক্তা ও পরিবর্তনের কারিগর হিসেবে গড়ে তোলা। কল্পনাশক্তির জোরেই তরুণরা নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সি আর আবরার। ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব রেহানা পারভীন এবং বিশ্বব্যাংকের ডিভিশন ডিরেক্টর জ্যঁ পেসমে। স্বাগত বক্তব্য দেন ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তানজিমউদ্দিন খান।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রধান উপদেষ্টার এই বক্তব্য শিক্ষা সংস্কার, তরুণ নেতৃত্ব এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা নিয়ে জাতীয় আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে, যা ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।