উত্তরাঞ্চলের মানুষের জন্য আধুনিক ও বিশেষায়িত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে নীলফামারীতে এক হাজার শয্যাবিশিষ্ট বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী জেনারেল হাসপাতাল একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক চিকিৎসা কেন্দ্রে পরিণত হবে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস।
রোববার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়ার পর তিনি বলেন, দেশের স্বাস্থ্যসেবার ওপর রংপুর ও ঢাকাকেন্দ্রিক অতিরিক্ত চাপ কমাতে বিকেন্দ্রীকরণ এখন সময়ের দাবি। নীলফামারীতে এই হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হলে উত্তরাঞ্চলের জনগণ নিজ এলাকায় থেকেই উন্নত ও বিশেষায়িত চিকিৎসা সেবা পাওয়ার সুযোগ পাবে।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এই হাসপাতাল কেবল একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়, বরং দেশের স্বাস্থ্যখাতের মানোন্নয়নে একটি কৌশলগত বিনিয়োগ। তার মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ শুধু নিজ দেশের রোগীদের জন্য নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার স্বাস্থ্যসেবাতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে। নেপাল ও ভুটানের মতো প্রতিবেশী দেশের রোগীরাও এখানে উন্নত চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ পাবেন, যা বাংলাদেশকে আঞ্চলিক স্বাস্থ্যসেবার একটি কেন্দ্রে রূপ দিতে পারে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের উদ্যোগে এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বাস্তবায়নে প্রকল্পটি ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে বাস্তবায়ন করা হবে। মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৪৫৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়ন ১৭৯ কোটি ২৭ লাখ টাকা এবং অবশিষ্ট অর্থ চীনের অনুদান সহায়তা হিসেবে আসবে।
সরকারি সূত্র জানায়, গত বছরের মার্চে চীন সফরের সময় প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের কাছে বাংলাদেশে একটি আধুনিক হাসপাতাল স্থাপনের অনুরোধ জানান। সেই আলোচনার ধারাবাহিকতায় দ্রুত সময়ের মধ্যেই এই প্রকল্পের প্রস্তাবনা চূড়ান্ত করা হয়।
প্রকল্পের আওতায় নীলফামারী সদর উপজেলায় একটি আধুনিক ১০ তলা হাসপাতাল ভবন নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য আবাসিক ভবন ও ডরমেটরি, পরিচালক ভবন, সহায়ক অবকাঠামো এবং অত্যাধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম স্থাপন করা হবে।
এই হাসপাতালে সাধারণ চিকিৎসার পাশাপাশি নেফ্রোলজি, কার্ডিওলজি, অনকোলজি, নিউরোলজি ও অন্যান্য বিশেষায়িত বিভাগ চালু করা হবে। আধুনিক জরুরি বিভাগ, আইসিইউ, সিসিইউ ও এইচডিইউ, উন্নত ডায়াগনস্টিক সুবিধা এবং পূর্ণাঙ্গ অপারেশন থিয়েটারের মাধ্যমে জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি রোগের চিকিৎসা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে স্বাস্থ্যখাতে বড় পরিসরে কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী রাজস্ব খাতে প্রায় ৮৯৩ জন চিকিৎসক, ১,১৯৭ জন নার্স এবং ১,৪১০ জন অন্যান্য জনবল নিয়োগ দেওয়া হবে, যা স্থানীয় অর্থনীতি ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াবে।
নীলফামারী জেলায় প্রায় ২১ লাখ মানুষের বসবাস, যার বড় অংশ গ্রামীণ ও আধা-শহর এলাকায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী এই জনসংখ্যার জন্য প্রয়োজনীয় শয্যার তুলনায় বর্তমান জেলা পর্যায়ের সক্ষমতা অনেক কম। বিদ্যমান হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ, ডায়ালাইসিস, পূর্ণাঙ্গ ক্যান্সার ইউনিট ও বিশেষায়িত কার্ডিয়াক বা নিউরো সেবার সীমাবদ্ধতার কারণে গুরুতর রোগীদের রংপুর বা ঢাকায় পাঠাতে হয়।
নতুন হাসপাতালটি চালু হলে দীর্ঘ ভ্রমণজনিত ভোগান্তি ও ব্যয় কমবে, সময়মতো জীবনরক্ষাকারী সেবা নিশ্চিত হবে এবং উত্তরাঞ্চলের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় একটি টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করছে সরকার।
আরো পড়ুন: