বাংলাদেশে গুমকে সবচেয়ে ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনগুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করে সাবেক বিচারপতি ও গুম সংক্রান্ত অনুসন্ধান কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মঈনুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, গুম অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুর চেয়েও বেশি নির্মম। তার মতে, মৃত্যুর পর পরিবার অন্তত প্রিয়জনের দাফন-কাফন ও শোক প্রকাশের সুযোগ পায়, কিন্তু গুমের ক্ষেত্রে পরিবার দীর্ঘ সময় অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মধ্যে আটকে থাকে—জানতেও পারে না ভুক্তভোগী জীবিত নাকি মৃত।
ঢাকার ধানমন্ডিতে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ল অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স (বিলিয়া) আয়োজিত ‘বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি: একটি পর্যালোচনা’ শীর্ষক এক সিম্পোজিয়ামে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। আলোচনায় দেশের সাম্প্রতিক মানবাধিকার ইতিহাস, রাষ্ট্রীয় দায় এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা উঠে আসে।
বিচারপতি মঈনুল বলেন, গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবার বছরের পর বছর এক ধরনের স্থগিত বাস্তবতায় বসবাস করে। আশা ও হতাশার মাঝামাঝি এই জীবন তাদের সামাজিক কলঙ্ক, আর্থিক সংকট এবং একঘরে হয়ে পড়ার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করে। তিনি বলেন, এই মানসিক যন্ত্রণা অনেক সময় ভুক্তভোগীর পরিবারের জন্য আজীবন বয়ে বেড়ানোর বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
পূর্ববর্তী সরকারের সময়কার মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, সে সময় গুম একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছিল এবং রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। তার ভাষায়, জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সেই ধারাবাহিকতার অবসান ঘটে, যেখানে সাধারণ মানুষ কর্তৃত্ববাদ ও ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল।
বিচারপতি মঈনুল অভিযোগ করেন, রাষ্ট্রযন্ত্র অনেক ক্ষেত্রে গুমের শিকার ব্যক্তিদের অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করত, যাতে এসব কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়া যায়। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার কিছু কর্মকর্তাকে উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে এমনভাবে পরিচালিত করা হয়েছিল, যাতে মানবিক বিবেচনা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তারা এসব কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন করতে পারে।
তিনি গুম সংক্রান্ত তদন্তকে ‘অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ও মানসিকভাবে ক্লান্তিকর’ প্রক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করেন, যা ভয়াবহ নিষ্ঠুরতার চিত্র উন্মোচন করেছে। তার মতে, নাগরিকদের সুরক্ষায় কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার অভাবই এই ধরনের লঙ্ঘন দীর্ঘস্থায়ী করেছে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০০৯-কে তিনি তীব্র সমালোচনা করে বলেন, আইনটি কার্যত ‘দন্তহীন ও নখহীন’ ছিল। এর ফলে লঙ্ঘনকারীদের জবাবদিহির আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। একই সঙ্গে তিনি বলেন, সে সময় বিচার বিভাগও পর্যাপ্ত স্বাধীনতা ভোগ করেনি; অনেক বিচারক প্রভাবশালী শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারেননি।
‘বিচারিক স্বেচ্ছাচারিতার চেয়ে ভয়াবহ কোনো স্বৈরাচার নেই,’—বলেছেন বিচারপতি মঈনুল। তার মতে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কেবল সাংবিধানিক কাঠামোর বিষয় নয়, এটি একটি মানসিক অবস্থাও—যা আদালতে যে পক্ষই থাকুক না কেন, অটুট থাকতে হবে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, প্যারিস নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৫ বাস্তবায়নের মাধ্যমে মানবাধিকার সুরক্ষা কাঠামো আরও শক্তিশালী হবে। সাহসী ও নির্ভীক বিচার বিভাগই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে এবং গুমসহ গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বিচারপতি মঈনুল বলেন, চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো এমন একটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে প্রতিটি নাগরিক তার মৌলিক অধিকার রক্ষায় আদালতের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখতে পারে—এবং যেখানে গুমের মতো অপরাধ আর কখনো রাষ্ট্রীয় নীরবতার আড়ালে ঘটতে না পারে।
আরো পড়ুন: