গণভোটের এক সিদ্ধান্তে বদলাতে পারে রাষ্ট্র পরিচালনার নিয়ম

গণভোটের এক সিদ্ধান্তে বদলাতে পারে রাষ্ট্র পরিচালনার নিয়ম

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ২১:৩০

আপডেট: ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ২২:১৬

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে আগামী বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি)। তবে এবার ভোটারদের সিদ্ধান্ত শুধু নতুন সংসদ গঠনেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। একই দিনে একটি বিরল ও তাৎপর্যপূর্ণ গণভোটের মাধ্যমে তারা দেশের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সুযোগ পাচ্ছেন।

এই গণভোটে নাগরিকদের সামনে রাখা হচ্ছে একটি সরল প্রশ্ন- জুলাই চার্টার নামে পরিচিত সাংবিধানিক সংস্কার প্যাকেজটি তারা অনুমোদন করেন কি না? প্রশ্নটি সহজ হলেও এর তাৎপর্য গভীর। কারণ এই চার্টারের মধ্যেই নিহিত রয়েছে রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামো, ক্ষমতার বণ্টন এবং ভবিষ্যৎ সংসদের দায়বদ্ধতার দিকনির্দেশনা।

ভোটাররা নির্বাচনের ব্যালটের পাশাপাশি একটি আলাদা ব্যালট পেপার পাবেন গণভোটের জন্য। সেখানে পৃথক সংস্কার প্রস্তাব নয় বরং পুরো জুলাই চার্টারের পক্ষে বা বিপক্ষে ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’ ভোট দিতে হবে।

যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটার ‘হ্যাঁ’ বলেন, তাহলে চার্টারটি আইনগত ভাবে বাধ্যতামূলক হয়ে যাবে। সে ক্ষেত্রে পরবর্তী সংসদকে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতায় গৃহীত ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতেই হবে। এর মধ্যে ৪৭টি সরাসরি সংবিধান সংশোধনের সঙ্গে যুক্ত, যা প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি, সংসদ, বিচার বিভাগ ও নির্বাচন ব্যবস্থার ক্ষমতা ও ভূমিকা নতুন ভাবে নির্ধারণ করবে।

অন্যদিকে, ‘না’ ভোটের অর্থ হবে- জুলাই চার্টারের কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা থাকবে না। তখন নির্বাচনে জয়ী দল চাইলে কিছু সংস্কার নিতে পারে, আবার চাইলে পুরো প্রক্রিয়াই স্থগিত রাখতে পারবে। চার্টারে নির্ধারিত রোডম্যাপ অনুসরণ করার কোনো সাংবিধানিক বা আইনি বাধ্যবাধকতা থাকবে না।

জুলাই চার্টারের সূচনা হয়েছিল ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর, যার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। ০৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সংবিধান, নির্বাচন, বিচার বিভাগ, পুলিশ ও জনপ্রশাসনে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে একাধিক সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। এসব কমিশনের সুপারিশ পরে ৩০টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে পরিমার্জিত হয়ে ৮৪ দফার একটি সমঝোতা প্যাকেজে রূপ নেয়।

চার্টার অনুমোদিত হলে নতুন সংসদ শুধু আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবেই নয়, একটি সাংবিধানিক সংস্কার কাউন্সিল হিসেবেও কাজ করবে। সংসদ সদস্যদের নয় মাস বা ২৭০ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক সংশোধনী পাস করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংসদ ব্যর্থ হলে, আগে থেকেই প্রস্তুত করা সংশোধনী বিল স্বয়ংক্রিয় ভাবে কার্যকর হওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।

প্রস্তাবিত সংস্কারের অন্যতম লক্ষ্য হলো একক নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন কমানো। চার্টার অনুযায়ী, কেউ সর্বোচ্চ ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতা কমিয়ে বিরোধী দল ও কিছু ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের প্রতিনিধিত্বসহ নির্বাচন কমিটির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

একইসঙ্গে রাষ্ট্রপতির কিছু ক্ষমতা বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে। মানবাধিকার কমিশন ও বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নিয়োগে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা জোরদার করা হবে। রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদানের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের সম্মতি বাধ্যতামূলক করা এবং রাষ্ট্রপতি অপসারণে সংসদের দুই কক্ষে শক্ত সমর্থনের শর্ত আরোপের প্রস্তাবও রয়েছে।

জুলাই চার্টারের আরেকটি বড় প্রস্তাব হলো দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ চালু করা। বর্তমান সংসদের পাশাপাশি ১০০ সদস্যের একটি উচ্চকক্ষ গঠনের কথা বলা হয়েছে, যেখানে দলগুলোর জাতীয় ভোটের অনুপাতে আসন বণ্টন হবে। 

সমর্থকদের মতে, এতে কোনো একক দল একতরফা ভাবে সংবিধান পরিবর্তন করতে পারবে না, কারণ সংশোধনের জন্য দুই কক্ষের অনুমোদন লাগবে।

সংসদীয় জবাবদিহিতা বাড়াতেও বেশ কিছু পরিবর্তনের প্রস্তাব এসেছে। অধিকাংশ বিষয়ে সংসদ সদস্যদের দলীয় নির্দেশনা ছাড়াই স্বাধীন ভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকবে। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সংসদীয় কমিটির নেতৃত্ব যাবে বিরোধী দলের হাতে, আর ডেপুটি স্পিকারও হবেন বিরোধী দলের একজন সদস্য।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করাও সংস্কার প্রস্তাবের কেন্দ্রীয় অংশ। প্রধান বিচারপতি নিয়োগে আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারকদের মধ্য থেকে বাছাই, হাইকোর্ট বিচারপতি নিয়োগে আলাদা কমিশন, আঞ্চলিক হাইকোর্ট বেঞ্চ এবং সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক সচিবালয় গঠনের প্রস্তাব এতে অন্তর্ভুক্ত।

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়লে সাংবিধানিক সংশোধনের বাইরেও আইন ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে আরও কিছু সংস্কারের পথ খুলে যাবে। এর মধ্যে রয়েছে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল, সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ, সংসদে নারীদের প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, জরুরি ক্ষমতা সংস্কার এবং আদালত ও জনপ্রশাসনের আধুনিকীকরণ।

এছাড়া, এই গণভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির জারি করা জুলাই চার্টার বাস্তবায়ন আদেশের প্রতিও জনগণের অনুমোদন চাওয়া হচ্ছে, যা ২০২৪ সালের গণআন্দোলনের পর শুরু হওয়া সংস্কার প্রক্রিয়াকে আনুষ্ঠানিক জনসমর্থন দেবে।

যদি ভোটাররা ‘না’ বলেন, তাহলে চার্টার কার্যত বাতিল হয়ে যাবে। তখন ভবিষ্যৎ সরকার চাইলে কিছু সংস্কার এগিয়ে নিতে পারে, তবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পরিবর্তন অনিশ্চিতই থেকে যাবে।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটারদের সামনে সিদ্ধান্তটি শুধু প্রতিনিধিত্ব বাছাইয়ের নয়। এটি একটি মৌলিক প্রশ্ন- ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে উত্থাপিত দাবিগুলো কি স্থায়ী ভাবে আইনের কাঠামোয় বাঁধা হবে, না কি সেগুলো ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দর কষাকষির ওপর ছেড়ে দেওয়া হবে। সেই উত্তরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের পরবর্তী পথচলা।