রাত পোহালেই নতুন সূচনা

রাত পোহালেই নতুন সূচনা
প্রতিকী ছবি।

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ২১:০৩

আপডেট: ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৭:৫১

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট বৃহস্পতিবার। এই নির্বাচনকে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংকটপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ দেশের নাগরিকদের জন্য দিনটি হলো একটি গণতান্ত্রিক প্রত্যাশার পরীক্ষণ, যেখানে প্রতিটি ভোটার তার ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য নিজের সিদ্ধান্ত নেবে। 

ছাত্র-জনতার গণভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ২০২৪ সালের ০৫ অগাস্ট টানা ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী আওয়ামী শাসনামলের অবসান ঘটে। ০৮ আগস্ট গঠিত হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। গত দেড় বছরে দেশের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং একটি গ্রহণযোগ্য ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। সেই আকাঙ্খিত দিনটি হলো বৃহস্পতিবার।

বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত সারাদেশে ভোটগ্রহণ চলবে। এবার সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে হওয়ায় ভোটগ্রহণের সময় একঘণ্টা বাড়িয়ে মোট ৯ ঘণ্টা নির্ধারণ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। পাশাপাশি এবার নতুনভাবে পোস্টাল ভোট ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একদিনে দুটি ভোট আয়োজনের কারণে বাড়তি সময় প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়েই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

নির্বাচনের সঙ্গে গণভোটও একই সময়ে হচ্ছে। যেখানে জনগণ সংবিধান ও রাজনীতির ভবিষ্যৎ কাঠামোর বিষয়ে সরাসরি মতামত জানাচ্ছে। এটি বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অন্যতম দৃঢ় উদাহরণ, যেখানে শুধুমাত্র প্রতিনিধি নির্বাচন নয়, সংবিধানগত সিদ্ধান্তও জনগণের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৯টি সংসদীয় আসনে ৫০টি রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ মোট দুই হাজার ২৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যার মধ্যে ৮১ জন নারী। নির্বাচন সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর করতে মাঠ পর্যায়ে অভূতপূর্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ।

তিনি বলেন, 'সারাদেশে মোট ৪২ হাজার ৬৫৯টি কেন্দ্রে সরাসরি ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া ২৯৯টি কেন্দ্রে পোস্টাল ভোট গণনা করা হবে। সব মিলিয়ে মোট কেন্দ্রের সংখ্যা ৪২ হাজার ৯৫৮টি। ইন-পার্সন ভোটিংয়ের জন্য নির্ধারিত কেন্দ্রগুলোর প্রায় ৫০ শতাংশকে ‘সাধারণ’ এবং বাকি ৫০ শতাংশকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ বা ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, 'এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখের বেশি, যার মধ্যে পুরুষ ভোটার ছয় কোটি ৪৮ লাখ এবং নারী ভোটার ছয় কোটি ২৮ লাখ।'

মো. সানাউল্লাহ বলেন, 'নির্বাচন পর্যবেক্ষণে এবার বিশাল বহর থাকছে। দেশীয় পর্যবেক্ষক হিসেবে অ্যাক্রেডিটেশন পেয়েছেন ৪৫ হাজার ৩৩০ জন। এর মধ্যে ৩৫০ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক রয়েছেন, যা আরও বাড়তে পারে। সংবাদ সংগ্রহের জন্য নয় হাজার ৭০০ জন সাংবাদিক নিবন্ধন করেছেন, যাদের মধ্যে ১৫৬ জন বিদেশি সংবাদকর্মী।'

তিনি বলেন, 'নির্বাচনকালীন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত থাকছে নয় লাখ ৫৮ হাজার সদস্য। দায়িত্ব পালন করবেন দুই হাজার ৯৮ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং ৬৫৭ জন বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট। নিরাপত্তায় এবার যুক্ত হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তি। প্রথমবারের মতো ব্যবহার করা হচ্ছে ইউএভি (ড্রোন) এবং বডি ওর্ন ক্যামেরা। এছাড়া ৯৫ শতাংশের বেশি কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।'

মো. সানাউল্লাহ বলেন, 'মাঠ পর্যায়ে ৬৯ জন রিটার্নিং অফিসার, ৯৫৮ জন সহকারী রিটার্নিং অফিসার এবং পাঁচ লক্ষাধিক পোলিং অফিসার ভোটগ্রহণের কাজে নিয়োজিত থাকবেন। বুধবার সকাল থেকে সহকারী রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় থেকে ব্যালট পেপার ও নির্বাচনী সামগ্রী বিতরণ শুরু হবে।'

তিনি বলেন, 'সংশোধিত নিয়ম অনুযায়ী- এবার ভোটার স্লিপে প্রার্থীর নাম ও প্রতীক থাকতে পারবে। নির্বাচনের দিন প্রতি দুই ঘণ্টা অন্তর অগ্রগতির রিপোর্ট প্রদান করা হবে (মোট চার বার)। গণভোট ও সংসদ নির্বাচনের ফলাফল একইসাথে ঘোষণা করা হবে। বেশির ভাগ ফলাফল মধ্য রাতের মধ্যে পাওয়া যাবে বলে আশা করছে ইসি। পরের দিন সকালে রিটার্নিং অফিসার ‘ফর্ম-১৮’ তে স্বাক্ষর করার পর আনুষ্ঠানিক ভাবে গেজেট প্রকাশিত হবে।'

তিনি আরও বলেন, 'নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে এ পর্যন্ত ৩০০টি মামলা দায়ের এবং ৫০০টিরও বেশি তদন্ত করা হয়েছে। এছাড়া, ১৩ ডিসেম্বর থেকে এ পর্যন্ত ৮৫০টি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। দুষ্টচক্র সহিংসতা ঘটাতে চাইলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তা নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে। কুমিল্লা, যশোর ও ফরিদপুরসহ বিভিন্ন স্থানে অস্ত্র উদ্ধার অভিযান তারই প্রমাণ।'

ভোটারদের ব্যাপক উপস্থিতির বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে মো. সানাউল্লাহ বলেন, 'মানুষের মাঝে ব্যাপক উচ্ছ্বাস দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা ছেড়ে মানুষের গ্রামে যাওয়ার ঢল দেখে ভালো ভোটার টার্নআউটের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। কমিশন সকল রাজনৈতিক দল ও সমর্থকদের সুন্দর ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে ভোট উৎসব সম্পন্ন করার আহ্বান জানিয়েছে।'

নির্বাচনের মাধ্যমে যদি সত্যিকার অর্থেই জনগণের ইচ্ছা প্রতিফলিত হয়, তাহলে এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চেতনার প্রতি নতুন উদ্দীপনা যোগাবে। এর ফলে নীতি, সামাজিক উন্নয়ন ও মানবাধিকারের মূল্য আরও দৃঢ় ভাবে প্রতিষ্ঠা পেতে পারে।