গণমাধ্যমে তথ্য বিকৃত হলে সমাজে বিভ্রান্তি, সংঘাত ও নৈরাজ্য সৃষ্টি হয় বলে জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন।
শুক্রবার সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবনে ল’ রিপোর্টার্স ফোরামের (এলআরএফ) বার্ষিক সাধারণ সভা-২০২৬ ও রজতজয়ন্তী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
তথ্যমন্ত্রী বলেন, 'দেশের সচেতন মানুষ শুধু তথ্যের জন্যই সাংবাদিকদের দিকে তাকিয়ে থাকে না, বরং বিচার প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ও বস্তুনিষ্ঠ ভাবে পরিচালিত হচ্ছে, সে সম্পর্কেও গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করে। তাই বিচার বিভাগ সংশ্লিষ্ট সংবাদ পরিবেশনে সাংবাদিকদের দায়িত্বশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।'
তিনি বলেন, 'বাংলাদেশের প্রধান গণমাধ্যমগুলোর প্রতিনিধিরা ল' রিপোর্টার্স ফোরামের মাধ্যমে বিচার বিভাগের কার্যক্রম জনগণের সামনে তুলে ধরছেন। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে গণমাধ্যমকে চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, কারণ গণমাধ্যমই রাষ্ট্র ও সমাজের কার্যক্রমের স্বচ্ছ প্রতিফলন জনগণের সামনে উপস্থাপন করে।
জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, 'গণমাধ্যমের দায়িত্বশীলতা ও বস্তুনিষ্ঠতার ওপরই নির্ভর করে নাগরিকরা রাষ্ট্র পরিচালনার চলমান প্রক্রিয়া সম্পর্কে সঠিক মূল্যায়ন করতে পারেন। তারা সিদ্ধান্ত নিতে পারেন রাষ্ট্র সঠিক পথে চলছে কি না, চলমান প্রক্রিয়াকে সমর্থন করবেন না কি পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নেবেন।'
তিনি বলেন, 'আয়না যেমন নিখুঁত না হলে মানুষের চেহারার বিকৃত প্রতিচ্ছবি দেখা যায়, তেমনি গণমাধ্যমও যদি বস্তুনিষ্ঠ না হয়, তাহলে রাষ্ট্র ও সমাজ সম্পর্কে ভুল প্রতিচ্ছবি জনগণের সামনে উপস্থাপিত হবে। সত্য এক জায়গায় অবস্থান করে, কিন্তু বিকৃত তথ্যের ভিত্তিতে সমাজে নানা ধরনের সংঘাত ও নৈরাজ্যের সৃষ্টি হতে পারে।'
তিনি আরও বলেন, 'বিচার বিভাগ রাষ্ট্রের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। এমনকি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেও নাগরিকরা বিচার বিভাগের কাছেই প্রতিকার চান। ফলে বিচার বিভাগ সংশ্লিষ্ট সংবাদ পরিবেশনকারী সাংবাদিকদের দায়িত্ব আরও বেশি।'
মন্ত্রী বলেন, 'বর্তমান বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এনালগ থেকে ডিজিটাল যুগে প্রবেশের ফলে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক প্রসার যেমন মানুষের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে, তেমনি নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জও তৈরি করেছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বিশ্বব্যাপী নতুন বাস্তবতা সৃষ্টি করেছে।'
তিনি বলেন, 'কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করা যেমন সম্ভব নয়, তেমনি কোনো প্রস্তুতি ছাড়া এর সর্বাত্মক ব্যবহারও সমাধান নয়। বর্তমান প্রযুক্তির মাধ্যমে এমন সব ভুয়া ছবি, ভিডিও ও তথ্য তৈরি করা সম্ভব, যা দেখতে বাস্তব মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে সত্য নয়। ফলে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আইনের দ্রুত সংস্কার ও আধুনিকায়ন জরুরি।'
জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, 'সরকার ইতোমধ্যে দেশের সাইবার আইন নিয়ে কাজ শুরু করেছে। এ লক্ষ্যে মন্ত্রিপরিষদ একটি কমিটি গঠন করেছে, যেখানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইসিটি মন্ত্রীসহ তিনি সদস্য হিসেবে কাজ করছেন।'
তিনি বলেন, 'সরকার একা এ কাজ করতে পারবে না। প্রযুক্তিনির্ভর নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কার্যকর আইন প্রণয়নে ল’ রিপোর্টার, আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতা প্রয়োজন।' সরকার এ বিষয়ে তাদের কাছ থেকে পরামর্শ নেবে এবং এজন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, ল’ রিপোর্টার্স ফোরামের বার্ষিক সাধারণ সভা কেবল সাংগঠনিক বা আর্থিক বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। সমাজ ও সভ্যতার এই জটিল সময়ে কী ধরনের দায়িত্ব পালন করা প্রয়োজন, সে বিষয়েও সংগঠনটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।'
মন্ত্রী বলেন, 'গণমাধ্যমের প্রধান দায়িত্বই হচ্ছে মানুষকে সত্যের সামনে উপস্থাপন করা। বিশেষ করে আইন অঙ্গনে কর্মরত সাংবাদিকদের জন্য বস্তুনিষ্ঠতাই একমাত্র মানদণ্ড। প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভবিষ্যতের জটিল বিশ্বকে মানুষের বাসযোগ্য রাখতে প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কারে ল' রিপোর্টার্স ফোরাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।'
এলআরএফের সভাপতি হাসান জাবেদের সভাপতিত্বে সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান মিশনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল, বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল, সুপ্রীম কোর্ট বার এ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক মোহাম্মদ আলী, বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার নাসির উদ্দিন আহমেদ অসীম, সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির, দৈনিক ইত্তেফাকের নির্বাহী সম্পাদক সালেহ উদ্দিন।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন, সংগঠনের সাবেক সভাপতি স্বপন দাশ গুপ্ত, এম বদিউজ্জামান, সাইদ আহমেদ, আশুতোষ সরকার, ওয়াকিল আহমেদ হিরণ, মাসহুদুল হক, সাবেক সাধারণ সম্পাদক দিদারুল আলম দিদার, আহমেদ সারোয়ার হোসেন ভূঁইয়া৷
আরো পড়ুন: