টানা ভারী বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল, আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ধসে চট্টগ্রাম বিভাগে ভয়াবহ মানবিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ জেলায় প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে ৩৯ জনে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে প্রায় ৯ লাখ ২৮ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বিস্তীর্ণ এলাকা এখনও পানির নিচে থাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের শুক্রবার (১০ জুলাই) প্রকাশিত পরিস্থিতি প্রতিবেদনে জানানো হয়, সবচেয়ে বেশি ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে কক্সবাজারে। নিহতদের মধ্যে ১৩ জন রোহিঙ্গা। এছাড়া চট্টগ্রামে ৮ জন, বান্দরবানে ৬ জন এবং রাঙামাটিতে ২ জনের মৃত্যু হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক দিনের টানা বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসে জেলার ১৬টি উপজেলা এবং নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলার ১৭৬টি ইউনিয়ন ও পৌরসভা বন্যাকবলিত হয়েছে।
দুর্গত মানুষের জন্য ৬৭৩টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন ২৩ হাজার ৮৫৩ জন।
ত্রাণ কার্যক্রমে সরকার ৭০০ টন চাল ও ৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এর মধ্যে ৩০০ টন চাল, ৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা, ২২ হাজার ২৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ১৮ হাজার ৩৩০ প্যাকেট রান্না করা খাবার ইতোমধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। আরও ৪০০ টন চাল ও ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা মজুত রয়েছে।
চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও বাঁশখালী উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির সবচেয়ে বেশি অবনতি হয়েছে। এ দুই উপজেলায় পাঁচ লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
বাঁশখালীর বাহারছড়া ইউনিয়নে বন্যার পানির স্রোতে ভেসে গিয়ে আশিক (১১) ও মিরাজ (৬) নামে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দুর্গম অনেক এলাকায় এখনও ত্রাণ পৌঁছেনি। টানা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা ও মোবাইল নেটওয়ার্ক অচল থাকায় যোগাযোগ এবং উদ্ধার কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের সাতকানিয়া অংশ কয়েক দিন ধরে পানির নিচে রয়েছে। বর্তমানে সীমিতভাবে যান চলাচল চালু থাকলেও পানি বাড়লে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সাঙ্গু ও ডলু নদীর পানি বৃদ্ধি এবং পাহাড়ি ঢলে সাতকানিয়ার বাজালিয়া, কেওচিয়া, ছদাহা, কালিয়াইশ, ধর্মপুর, খাগরিয়া, আমিলাইশ, ঢেমশা, নলুয়া, চরতি ও পুরানগড় ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বসতঘর, কৃষিজমি, মাছের ঘের, বাজার ও গ্রামীণ সড়ক পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক এলাকায় নৌকাই এখন একমাত্র যাতায়াতের মাধ্যম। নিরাপদ খাবার পানি, খাদ্য ও ওষুধের সংকটও তীব্র হয়ে উঠেছে।
কক্সবাজারে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চকরিয়া ও মাতামুহুরী এলাকা। ১৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা প্লাবিত হওয়ায় প্রায় তিন লাখ মানুষ পানিবন্দি।
অন্যদিকে, ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ধসে সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় রাঙামাটির সাজেকে আটকে পড়া ৪৬১ জন পর্যটককে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী উদ্ধার করেছে।
নিরাপত্তার স্বার্থে বান্দরবানের সব পর্যটনকেন্দ্রের বন্ধ থাকার মেয়াদ ১৫ জুলাই পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং রিজিওনাল ইন্টিগ্রেটেড মাল্টি-হ্যাজার্ড আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম (রাইমস) জানিয়েছে, ১২ জুলাই পর্যন্ত চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। পাঁচটি জেলাকেই পাহাড়ধসের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বন্যাকবলিত এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম আরও জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী সার্বক্ষণিকভাবে বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং জেলা প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিচ্ছেন।
আরো পড়ুন: