দেশে ১,৪০০ বৈদ্যুতিক বাস চালুর পরিকল্পনা, ডিসেম্বরেই নামতে পারে সড়কে

দেশে ১,৪০০ বৈদ্যুতিক বাস চালুর পরিকল্পনা, ডিসেম্বরেই নামতে পারে সড়কে
ছবি: সংগৃহীত

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯ জুলাই, ২০২৬ ১৬:১৫

আপডেট: ১৯ জুলাই, ২০২৬ ২১:৫৮

বাংলাদেশের গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আধুনিক এবং পরিবেশবান্ধব করতে একটি বড় পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক জানিয়েছেন, দেশের রাস্তায় প্রায় ১ হাজার ৪০০টি বৈদ্যুতিক বাস (EV) নামানোর কাজ চলছে। সবকিছু ঠিক থাকলে এই বছরের ডিসেম্বর বা আগামী বছরের শুরুতেই নির্দিষ্ট কিছু রুটে এই বাসগুলো চলতে শুরু করবে।

"নীতিগত ও কৌশলগত বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, বৃহৎ পরিসরের এই ইভি প্রকল্পটি কেবল দেশের যাতায়াত অবকাঠামোর একটি সাধারণ আধুনিকায়ন নয়। বরং এটি গভীর অর্থনৈতিক সংকটকালে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ব্যয়বহুল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস ও ডিজেল আমদানি হ্রাসের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রক্ষা এবং জাতীয় মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতাকে পুনর্বিন্যাস করার এক সুদূরপ্রসারী জ্বালানি নীতি। 

ডলার সাশ্রয় ও বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর প্রভাব

বর্তমানে বিদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ ডলার খরচ করে ডিজেল ও তেল আমদানি করতে হয়, যা দেশের অর্থনীতির ওপর বড় চাপ তৈরি করে। বৈদ্যুতিক বাস চললে তেলের ব্যবহার কমবে, যার ফলে কোটি কোটি ডলার সাশ্রয় করা সম্ভব হবে।

তবে এর একটি অন্য দিকও রয়েছে। ১৪০০টি বড় বাস চার্জ করার জন্য প্রচুর বিদ্যুতের প্রয়োজন হবে। আমাদের জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড এই বাড়তি চাপ নিতে প্রস্তুত কি না, সেটি এখন বড় প্রশ্ন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দিনের বেলা যখন বিদ্যুতের চাহিদা বেশি থাকে, তখন চার্জ না দিয়ে গভীর রাতে (অফ-পিক আওয়ারে) চার্জ দেওয়ার ব্যবস্থা করলে বিদ্যুৎ খাতের ওপর চাপ পড়বে না।

 

বিদেশি অর্থায়ন ও প্রকল্পগুলোর বিবরণ

  • এই বিশাল বাস বহর কেনার জন্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দেশের কাছ থেকে সাহায্য নেওয়া হচ্ছে:
  • ৫০০টি বাসের জন্য একটি বড় ফান্ডের ব্যবস্থা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
  • দক্ষিণ কোরিয়ার সাহায্যে ৩০০টি বাস আনার প্রজেক্ট বড় করা হচ্ছে।
  • বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সাহায্যে আরও ৪০০টি বাস কেনার প্রস্তাব অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে।
  • এর বাইরে নিজস্ব অর্থায়নে ৪০০ কোটি টাকার দুটি প্যাকেজ যুক্ত করা হয়েছে।
  • এছাড়াও, নারী যাত্রীদের জন্য ১০০টির বেশি বিশেষ বৈদ্যুতিক বাস আলাদাভাবে রাখা হবে, যা যাতায়াতকে আরও নিরাপদ করবে।

 

সরকারি চার্জিং স্টেশন ও বাসের মানদণ্ড

বৈদ্যুতিক বাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো চার্জিং স্টেশন। এর জন্য বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) দেশের ৬৪টি জেলায় তাদের নিজস্ব জায়গায় আধুনিক চার্জিং স্টেশন তৈরির পরিকল্পনা করেছে। এই স্টেশনগুলো সরকারি বাসের পাশাপাশি বেসরকারি বাস মালিকরাও নির্দিষ্ট শর্তে ব্যবহার করতে পারবেন।

সব কোম্পানির বাস যেন একই স্টেশন থেকে চার্জ নিতে পারে, সে জন্য বুয়েট এবং এমআইএসটি-এর বিশেষজ্ঞরা মিলে একটি নির্দিষ্ট কারিগরি মানদণ্ড তৈরি করছেন। এর মাধ্যমে বাসের ব্যাটারি ও চার্জিং প্রযুক্তি সবার জন্য এক রকম করা হবে।

 

কর ছাড় ও ভাড়ার ভারসাম্য

বেসরকারি বাস মালিকরা যাতে বৈদ্যুতিক বাস কিনতে আগ্রহী হন, সে জন্য সরকার কর বা ট্যাক্স কমানোর কথা ভাবছে। তবে সাধারণ ডিজেল বাসের চেয়ে বৈদ্যুতিক বাসের দাম ও পরিচালনার খরচ একটু বেশি।

তাই সাধারণ যাত্রীদের জন্য ভাড়া যেন সাশ্রয়ী থাকে এবং বাস মালিকদেরও যেন লোকসান না হয়, সে জন্য সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাথে ভর্তুকি (Subsidy) ও ভাড়ার নতুন কাঠামো নিয়ে আলোচনা চলছে।

 

মেট্রোরেলের বিকল্প: মনোরেলের ভাবনা

ঢাকার যেসব এলাকায় রাস্তা সরু বা ভৌগোলিক কারণে মেট্রোরেল তৈরি করা সম্ভব নয়, সেখানে বিকল্প হিসেবে ওপর দিয়ে চলা ছোট ট্রেন বা 'মনোরেল' (Monorail) চালুর কথা ভাবছে সরকার। বুয়েটকে ইতিমধ্যেই এর একটি সমীক্ষা করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

সব মিলিয়ে, এই বৈদ্যুতিক বাস ও পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থা যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে তা দেশের পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি তেল আমদানির খরচ কমিয়ে অর্থনীতিকে অনেকটাই স্বস্তি দেবে।