বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান জানিয়েছেন, আগামী সাধারণ নির্বাচনে তাঁর দল এককভাবে সরকার গঠনের বিষয়ে পূর্ণ আত্মবিশ্বাসী। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত জাতীয় ঐক্যের সরকার বা পুনরায় জোট গঠনের কোনো পরিকল্পনা বর্তমানে তাঁদের নেই। দীর্ঘ দুই দশকের নির্বাসন কাটিয়ে গত ডিসেম্বরে দেশে ফেরা ৬০ বছর বয়সী এই নেতা মনে করেন, একটি সুস্থ ও কার্যকর গণতন্ত্রের জন্য শক্তিশালী বিরোধী দল থাকা অপরিহার্য। তিনি যুক্তি দেন যে, প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিয়ে সরকার গঠন করলে সংসদীয় ব্যবস্থায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মতো কেউ থাকবে না। তাই জামায়াত যদি নির্বাচনে জয়লাভ করে, তবে তারা সংসদে একটি দায়িত্বশীল বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করবে বলেই তিনি প্রত্যাশা করেন।
গত ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতায় দেশের প্রধান আয়ের উৎস তৈরি পোশাক শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রেক্ষাপটে জামায়াতে ইসলামী সম্প্রতি স্থিতিশীলতার স্বার্থে অংশীদারিত্ব পুনর্নবীকরণের আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। তবে বিএনপি নেতৃত্ব এবার সেই পুরনো জোটের সমীকরণ থেকে বেরিয়ে এসে নিজস্ব স্বকীয়তায় ফেরার ইঙ্গিত দিচ্ছে। যদিও দলের নীতিনির্ধারকরা ৩০০ আসনের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়ের আশা করছেন, তারেক রহমান নিজে নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা উল্লেখ না করে কেবল প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের ওপর জোর দিয়েছেন। উল্লেখ্য যে, সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলো বিএনপির অনুকূলে থাকলেও তরুণ প্রজন্মের ‘জেন-জেড’ রাজনৈতিক দল ও অন্যান্য জোটের কারণে নির্বাচনী লড়াই বেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও তারেক রহমান একটি ভারসাম্যপূর্ণ এবং জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক অবস্থানের কথা ব্যক্ত করেছেন। শেখ হাসিনার পতনের পর ভারতের সাথে বর্তমান সম্পর্কের যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, সেই প্রেক্ষাপটে তিনি জানান যে বিএনপি কোনো নির্দিষ্ট দেশের দিকে ঝুঁকে পড়ার পরিবর্তে বাংলাদেশের ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে পারে এমন সব দেশের সাথেই বন্ধুত্ব বজায় রাখবে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন যে, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে যারা উন্নয়নমূলক ও উপযোগী প্রস্তাব দেবে, তারাই হবে বাংলাদেশের প্রকৃত অংশীদার। কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নই হবে একটি বিএনপি-নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।
মানবিক সংকট হিসেবে পরিচিত রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে তারেক রহমান একটি দায়িত্বশীল ও মানবিক অবস্থান তুলে ধরেন। ১২ লাখেরও বেশি শরণার্থীর বোঝা বহন করা বাংলাদেশের জন্য কঠিন হলেও, তিনি জোরপূর্বক প্রত্যাবাসনের ঘোর বিরোধী। তিনি জানান, রোহিঙ্গা শরণার্থীরা অবশ্যই তাদের নিজ দেশে ফিরে যাবে, তবে সেটি হতে হবে সম্পূর্ণ নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশে। মিয়ানমারে নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ এই শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়ে যাবে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতায় তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে। তারেক রহমানের এই বক্তব্যগুলো আগামী নির্বাচনে বিএনপির নীতিগত অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক বিশ্বের সাথে কাজ করার নতুন রূপরেখা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
Tag:
আরো পড়ুন: