বাংলাদেশের আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ময়দানে এক নতুন ঐক্যের সুর ধ্বনিত হচ্ছে। শনিবার হবিগঞ্জের নিউ ফিল্ড মাঠে ১১ দলীয় জোটের এক বিশাল নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, দেশকে আর কোনো ধরনের বিভক্তির পথে হাঁটতে দেওয়া হবে না। সকল প্রকার রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজনকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে তিনি একটি ন্যায়বিচারভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তাঁর মতে, বাংলাদেশ একটি ফুলের বাগানের মতো যেখানে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান—এই চার ধর্মের মানুষ যুগ যুগ ধরে সম্প্রীতির সাথে বসবাস করছে। ইসলামের আদর্শ অনুযায়ী ধর্মের ভিত্তিতে কারও ওপর বাড়াবাড়ি করাকে তিনি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ও ‘হারাম’ বলে উল্লেখ করেন।
জনসভায় ডা. শফিকুর রহমান দেশের বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও সামাজিক অবক্ষয় নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন যে, স্বাধীনতার শহীদদের স্বপ্ন ছিল একটি ন্যায় ও সাম্যের বাংলাদেশ, যেখানে মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি থাকবে এবং সন্তানরা সুশিক্ষা পাবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আজও নারীরা ঘরে ও কর্মস্থলে নিরাপদ নন এবং সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো উপেক্ষিত রয়ে গেছে। এই পরিস্থিতির জন্য তিনি সরাসরি ‘অসৎ নেতৃত্বকে’ দায়ী করেন। উর্বর ভূমি ও সম্পদে সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও কেবল যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে এ দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হচ্ছে না বলে তিনি মন্তব্য করেন। এই প্রেক্ষাপটে তিনি দুর্নীতির শেকড় উপড়ে ফেলার অঙ্গীকার নিয়ে একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার লড়াইয়ে দেশবাসীকে শামিল হওয়ার আহ্বান জানান।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা প্রসঙ্গে জামায়াত আমির এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি ঘোষণা করেন যে, ইনসাফের বাংলাদেশে সাধারণ নাগরিকের জন্য যে আইন প্রযোজ্য হবে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদধারী ব্যক্তি যেমন রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রীর জন্যও সেই একই আইন কার্যকর থাকবে। অপরাধী যেই হোক না কেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ থাকবে না। শিক্ষার মানোন্নয়ন নিয়ে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কেবল কাগুজে সার্টিফিকেটের কারখানায় সীমাবদ্ধ না রেখে দক্ষ জনবল তৈরির কেন্দ্রে পরিণত করা হবে। সেই দক্ষ জনশক্তিকে কাজে লাগিয়ে গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত শিল্পায়ন এবং কৃষিভিত্তিক কলকারখানা গড়ে তোলার এক সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার কথা তিনি ব্যক্ত করেন। বিশেষ করে চা-বাগান শ্রমিকদের অমানবিক জীবনযাত্রার অবসান ঘটিয়ে সেখানে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
নির্বাচনী কৌশলের অংশ হিসেবে ডা. শফিকুর রহমান আসন্ন ‘হ্যাঁ’ ভোটকে বাংলাদেশের বিজয়ের প্রতীক হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি মনে করেন, এই ভোটের মাধ্যমেই দেশের ‘পচা ও পুরনো’ রাজনীতির অবসান ঘটবে। ১১ দলীয় জোটের প্রতীকগুলোকে ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করে তিনি হবিগঞ্জের চারটি আসনেই জনগণের সমর্থন ও সহযোগিতা কামনা করেন। মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ ও যোগ্যতার মূল্যায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন যে, ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে আর কাউকে বঞ্চিত করা হবে না। একটি ঐক্যবদ্ধ ও ইনসাফপূর্ণ বাংলাদেশ বিনির্মাণে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীদের বিজয়ী করার আহ্বান জানিয়ে তিনি তাঁর বক্তব্য শেষ করেন।
আরো পড়ুন: