গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় ‘বোর্ড অব পিস’ বা ‘শান্তি পর্ষদ গঠন’ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ পর্ষদের চেয়ারম্যান তিনি নিজেই। এতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারকে প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
তবে ব্লেয়ারের এই নিয়োগ আন্তর্জাতিক মহলে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরাও। ট্রাম্পের এ পদক্ষেপের সঙ্গে ১৯ শতকের উপনিবেশবাদী কার্যকলাপের মিল রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন তারা। আল-জাজিরা, রয়টার্স।
ট্রাম্প বৃহস্পতিবার ঘোষণা করেন, যেকোনো সময়ের জন্য এই বোর্ড অত্যন্ত মর্যাদাবান একটা বোর্ড।
হোয়াইট হাউজের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, প্রত্যেক এক্সিকিউটিভ বোর্ড সদস্য গাজার স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করবে। এই দায়িত্বগুলোর মধ্যে রয়েছে, শাসন ক্ষমতা বৃদ্ধি, আঞ্চলিক সম্পর্ক পুনর্গঠন, বিনিয়োগ আকর্ষণ, বড় আকারের অর্থায়ন ও মূলধন সংগ্রহ।
টনি ব্লেয়ার এবং মারকো রুবিওর পাশাপাশি এই বোর্ডে থাকছেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। এছাড়াও রয়েছেন- অ্যাপোলো গ্লোবাল ম্যানেজমেন্টের সিইও মার্ক রোয়ান, বিশ্ব ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বঙ্গ এবং মার্কিন ডেপুটি ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজার রবার্ট গ্যাব্রিয়েল। গাজার জন্য বোর্ডের উচ্চ প্রতিনিধি হিসাবে নিযুক্ত করা হয়েছে সাবেক জাতিসংঘ দূত নিকোলে ম্লাদেনভকে।
এদিকে, শনিবার তুরস্ক ও মিসরের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প গাজা পুনর্গঠনের জন্য গঠিত ‘বোর্ড অব পিস’-এ যোগ দেওয়ার জন্য তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান ও মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
বার বার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে গাজায় ইসরাইলের অব্যাহত হামলা ও ফিলিস্তিনি হতাহতের মধ্যে শান্তি পর্ষদের তত্ত্বাবধানে নতুন কমিটি গঠন করা হলো। ইসরাইল ক্রমেই গাজার আরও বেশি ভূমি দখল করে চলেছে।
স্যাটেলাইট ছবির বরাত দিয়ে শুক্রবার বিবিসির এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজার কথিত হলুদ রেখা থেকে আরও গভীরে পৌঁছে গেছে ইসরাইলের সামরিক বাহিনী।
এর আগে বুধবার ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ ঘোষণা করেন।
নতুন কমিটি প্রসঙ্গে হামাসের জ্যেষ্ঠ নেতা বাসেম নাইম বলেন, ‘কমিটি গঠন সঠিক পদক্ষেপ। যুদ্ধবিরতি সুসংহত করা, যুদ্ধের পুনরাবৃত্তি রোধ, বিপর্যয়কর মানবিক সংকট মোকাবিলা ও ব্যাপক পুনর্গঠনের প্রস্তুতির জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
তবে উপত্যকায় ফিলিস্তিনের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নিরস্ত্রীকরণ, পুনর্গঠন ও দৈনন্দিন শাসনের সঙ্গে জড়িত পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরো প্রধানের উপদেষ্টা তাহের আল-নুনু আল-জাজিরাকে বলেন, 'কায়রোতে আলোচনায় রাফা ক্রসিং আবার চালু, সীমান্তে মিসর অংশে থাকা সহায়তার অবাধ প্রবেশ ও ইসরাইলের সেনা প্রত্যাহার নিশ্চিতের ওপর আলোকপাত করা হচ্ছে।'
তিনি বলেন, হামাসকে ‘গাজায় শান্তি এবং স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনার জন্য মধ্যস্থতাকারী ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে কাজ করতে হবে’।
তবে আল-নুনুর অভিযোগ, ‘ইসরাইল বার বার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করছে। অথচ হামাস ক্রসিং খুলে দেওয়া, সাহায্য প্রবেশের অনুমতি দেওয়া ও গাজা উপত্যকা থেকে দখলদার বাহিনীকে প্রত্যাহার নিশ্চিত করার জন্য মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে কাজ করছে।’
এদিকে, টনি ব্লেয়ারকে নিয়োগ দেওয়ায় সমালোচনার ঝড় উঠেছে আন্তর্জাতিক মহলে। টনি ব্লেয়ার ১৯৯৭ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধে ব্রিটেনকে শামিল করার জন্য তিনি দীর্ঘকাল ধরে সমালোচিত। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে তার ভূমিকা নিয়ে আগে থেকেই নেতিবাচক ধারণা রয়েছে।
মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের মতে, গাজার শাসন ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন এই ধরনের বোর্ড অনেকটা ‘ঔপনিবেশিক ধাঁচের’ শাসন কাঠামোর মতো মনে হতে পারে। বিশেষ করে ইরাক আক্রমণের পেছনে ব্লেয়ারের বিতর্কিত ভূমিকার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো তাকে গাজার শান্তি প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টিকে সহজ ভাবে গ্রহণ করছে না।
হোয়াইট হাউজ জানিয়েছে, গাজার দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য এবং স্থিতিশীলতার জন্য এই বোর্ড কাজ করবে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গাজায় একটি ‘আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী’ (আইএসএফ) কাজ করবে, যার নেতৃত্ব দেবেন সাবেক মার্কিন স্পেশাল অপারেশন কমান্ডার মেজর জেনারেল জ্যাসপার জেফারস।
আরো পড়ুন: