মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ঘোষণা দিয়েছেন, যদি অঞ্চলজুড়ে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থেকে ইরানের বিরুদ্ধে আক্রমণ বন্ধ করা হয়, তবে তেহরানও পাল্টা হামলা স্থগিত করতে প্রস্তুত। শনিবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক ভাষণে তিনি এই অবস্থান স্পষ্ট করেন এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা কমাতে শর্তসাপেক্ষে হামলা বন্ধের প্রস্তাব দেন।
প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান বলেন, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে প্রতিবেশী কয়েকটি দেশে ইরানের পক্ষ থেকে হামলা হয়েছে, যার জন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তবে তিনি দাবি করেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক আক্রমণ অব্যাহত থাকায় দেশটির সামনে বিকল্প খুব সীমিত ছিল। তার ভাষায়, ইরানের জনগণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কাছে কখনও আত্মসমর্পণ করবে না এবং স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নে আপসের সুযোগ নেই।
ভাষণে তিনি আরও বলেন, ইরানের শত্রুরা দেশটিকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে চাইলেও সেই লক্ষ্য সফল হবে না। বরং ইরানের জনগণ নিজেদের অবস্থান বজায় রাখবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ইরানের অস্থায়ী নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্তের কথা তুলে ধরে প্রেসিডেন্ট জানান, যদি প্রতিবেশী দেশগুলোর ভূখণ্ড থেকে ইরানের ওপর আক্রমণ বন্ধ হয়, তাহলে ইরানও ওই দেশগুলোকে লক্ষ্য করে আর হামলা চালাবে না। এই অবস্থানকে তিনি উত্তেজনা প্রশমনের একটি সম্ভাব্য পথ হিসেবে তুলে ধরেন।
এই সংঘাতের পটভূমিতে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে টানা তিন সপ্তাহ আলোচনা হয়েছিল। গত ৬ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া সেই সংলাপ ২৭ ফেব্রুয়ারি কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়। সংলাপ ভেস্তে যাওয়ার পরদিনই যুক্তরাষ্ট্র ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে। একই সময়ে ইসরায়েলও ‘অপারেশন রোয়ারিং লায়ন’ নামে পৃথক সামরিক অভিযান চালায়।
এই অভিযানের জবাবে ইরান ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে দফায় দফায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে জানানো হয়েছে। এসব হামলার প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো দেশের সঙ্গে ইরানের সরাসরি যুদ্ধ শুরু হয়নি।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মার্কিন গোয়েন্দা সূত্রের দাবি অনুযায়ী চলমান সংঘাতে রাশিয়া ইরানকে গোয়েন্দা সহায়তা দিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি, সেখানে মোতায়েন সেনা, যুদ্ধবিমান ও সামরিক সরঞ্জাম সম্পর্কিত তথ্য বিভিন্ন গোয়েন্দা চ্যানেলের মাধ্যমে তেহরানের কাছে পৌঁছানো হচ্ছে বলে এসব প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে মস্কোর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাতের প্রথম দিনেই ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। তার মৃত্যুর পর দেশটিতে তিন সদস্যের একটি অস্থায়ী নেতৃত্ব পরিষদ গঠন করা হয়েছে। সেই পরিষদের নেতৃত্বে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান। পরিষদের অন্য দুই সদস্য হলেন ইরানের বিচার বিভাগের প্রধান গোলাম হোসেন মোহসেনি-এজেই এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন জ্যেষ্ঠ সদস্য।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে এই সংঘাত এখনো আঞ্চলিক পর্যায়ে সীমিত থাকলেও এতে জ্বালানি সরবরাহ, বৈশ্বিক নিরাপত্তা এবং ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যের ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে তা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও প্রতিফলিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আরো পড়ুন: