তেহরান ও ওয়াশিংটন ব্যুরো মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে লেবানন সীমান্তে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম ধমনী ‘হরমুজ প্রণালি’ নিয়ে নতুন করে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। দীর্ঘ উত্তেজনার পর গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথটি উন্মুক্ত হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মাথায় ইরান পুনরায় তা বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। তেহরান স্পষ্ট জানিয়েছে, মার্কিন প্রশাসন যদি ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধ অব্যাহত রাখে, তবে এই কৌশলগত জলপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।
শনিবার ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে এই কড়া বার্তা আসে। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে, ইরানের সঙ্গে একটি ‘শান্তি চুক্তি’ প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং তেহরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত হস্তান্তরে রাজি হয়েছে। তবে ট্রাম্পের এই দাবিকে সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে ইরান সরকার। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইউরেনিয়াম মজুত নিয়ে কোনো ধরনের আপস বা তা অন্য কোথাও হস্তান্তরের প্রশ্নই আসে না।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সামাজিক মাধ্যমে এক বিবৃতিতে সতর্ক করে বলেছেন, মার্কিন যুদ্ধজাহাজ যদি ইরানের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে, তবে হরমুজ প্রণালি আর খোলা রাখা হবে না। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এই জলপথ দিয়ে আন্তর্জাতিক চলাচলের ক্ষেত্রে ইরানের সার্বভৌমত্বের বিষয়টি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘায়ি এই পরিস্থিতিকে ‘বাস্তব পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল’ বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, তথাকথিত নৌ-অবরোধ মূলত যুদ্ধবিরতির শর্তের লঙ্ঘন, যার উপযুক্ত জবাব দেওয়ার সক্ষমতা ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর রয়েছে।
এদিকে, ওয়াশিংটন থেকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর ভূমিকার প্রশংসা করে একে একটি ‘অসাধারণ’ দিন হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। তিনি আশা প্রকাশ করেছিলেন যে, এর ফলে জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরবে। মূলত এই আশাবাদ থেকেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমতে শুরু করেছিল এবং বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গিয়েছিল। তবে তেহরানের সাম্প্রতিক অনড় অবস্থান সেই স্থিতিশীলতাকে আবারও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের (LNG) প্রায় ২০ শতাংশই এই সংকীর্ণ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে সামান্য অস্থিরতাও বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে রাশিয়ার তেল বিক্রিতে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক কিছু ছাড় যখন সরবরাহে স্বস্তি দিচ্ছিল, ঠিক তখনই হরমুজ নিয়ে এই টানাপোড়েন জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
অন্যদিকে, লেবাননে ১০ দিনের সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর বাস্তুচ্যুত মানুষেরা তাদের ভিটেমাটিতে ফিরতে শুরু করেছেন। যদিও ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে তাদের মূল লক্ষ্য এখনো অর্জিত হয়নি। সার্বিক পরিস্থিতিতে মনে হচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু এখন স্থলপথ থেকে সরে গিয়ে সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণ এবং জ্বালানি কূটনীতির দিকে মোড় নিচ্ছে। হরমুজ প্রণালি সচল রাখা না রাখার ওপরই এখন নির্ভর করছে আগামী দিনের বিশ্ব জ্বালানি বাজারের ভবিষ্যৎ।
আরো পড়ুন: