ড্রামে খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার, নিহতের বন্ধুকে আসামি করে মামলা

ড্রামে খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার, নিহতের বন্ধুকে আসামি করে মামলা

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪ নভেম্বর, ২০২৫ ১৮:০৩

হাইকোর্ট সংলগ্ন জাতীয় ঈদগাহ মাঠের গেটের কাছে ড্রাম থেকে খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় মামলা হয়েছে। মামলায় নিহত আশরাফের বন্ধু জরেজ মিয়া (৪১) কে প্রধান আসামি করা হয়েছে। এছাড়াও মামলায় অজ্ঞাত আরও বেশ কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে।

শুক্রবার সকালে নিহত আশরাফুল হকের বোন আনজিনা বেগম বাদি হয়ে শাহবাগ থানায় মামলাটি দায়ের করেন।

শাহবাগ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) খালিদ মনসুর বলেন, 'ড্রামের ভেতর থেকে ব্যবসায়ী আশরাফুল হকের ২৬ টুকরা মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় সকালে একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলার বাদি নিহতের বোন আনজিনা বেগম। মামলায় নিহত আশরাফুলের বন্ধু জরেজ মিয়াকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। এছাড়াও অজ্ঞাত আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। 

তিনি বলেন, 'এখনও জড়িত কাউককে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। সিসিটিভি ফুটেজসহ অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করে দ্রুত জড়িতদের শনাক্ত করতে কাজ চলছে।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর জাতীয় ঈদগাহের সামনের সড়ক থেকে দুটি নীল রঙের ড্রামে খণ্ডিত অবস্থায় আশরাফুল হকের (৪৩) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তিন দিন আগে জরেজ মিয়া (৪১) নামের বন্ধুর সঙ্গে ঢাকায় এসে খুনের শিকার হন আশরাফুল। বর্তমানে তার ফোন নিয়ে পলাতক রয়েছেন সেই জরেজ মিয়া।

নিহত আশরাফুল হক রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার শ্যামপুরের গোপালপুর নয়াপাড়া গ্রামের মো. আ. রশিদের ছেলে। তিনি হিলি থেকে কাঁচামাল কিনে ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় পাইকারি বিক্রি করতেন বলে জানা গেছে।

জানা গেছে, আশরাফুল হক তিন দিন আগে অসুস্থ বাবাকে রংপুর হাসপাতালে রেখে প্রবাসী বন্ধু জরেজ মিয়ার সঙ্গে ঢাকা যান। এরপর থেকে স্ত্রী লাকী বেগম আশরাফুলকে ফোন করলে জরেজ মিয়া ফোন রিসিভ করতেন। আশরাফুলের খোঁজ করলে তিনি বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত আছেন বলে জানাতেন।  

এদিকে স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পেরে বৃহস্পতিবার (১৩ নভেম্বর) বিকেলে ভাইয়ের সঙ্গে বদরগঞ্জ থানায় যান লাকী বেগম। সেখানে গিয়ে জানতে পারেন, ঢাকায় স্বামী আশরাফুল হকের খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। শুনেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। 

এ বিষয়ে ডিএমপির রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মাসুদ আলম বলেন, 'বৃহস্পতিবার দুপুর ২টা থেকে ২টা ৩০ মিনিটের দিকে একটি ভ্যানে দুই ব্যক্তি এসে ড্রাম দুটি রাস্তার পাশে রেখে যায়। স্থানীয়রা এতটুকু বলতে পারছে। সন্ধ্যার দিকে যখন দুর্গন্ধ ছড়ায় তখন পুলিশকে খবর দিলে ড্রাম খুলে চালের ভেতর থেকে কালো পলিথিনে মোড়ানো খণ্ডিত মরদেহ বের করা হয়। আশপাশের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে জড়িতদের শনাক্তে চেষ্টা করা হবে।'

আশরাফুল হকের শ্যালক আব্দুল মজিদ বলেন, 'আশরাফুল তার বাবাকে রংপুরে একটি হাসপাতালে রেখে গত মঙ্গলবার মালয়েশিয়া ফেরত বন্ধু জরেজের সঙ্গে ঢাকায় যান। বুধবার বিকেল ৫টায় আশরাফুল তার স্ত্রী লাকী বেগমের সঙ্গে শেষ কথা বলেন। এরপর আর যোগাযোগ হয়নি। তাই তারা বৃহস্পতিবার বিকেলে বদরগঞ্জ থানায় জিডি করতে আসেন। এখানে এসে জানতে পারেন, আশরাফুল হককে ঢাকায় খুন করা হয়েছে।'

তিনি বলেন, 'গত বুধবার বিকেলে আমার বোনের সঙ্গে কথা হয় আশরাফুলের। তখন তিনি বলেছেন, বাবা হাসপাতালে, রিলিজ দেবে, টাকা-পয়সা দিছি। বাবাকে বাড়ি নিয়া আইসো। এটাই শেষ কথা। এরপর থেকে আশরাফুলকে কল দিলে তার বন্ধু জরেজ ধরে আর বলে আশরাফুল ব্যস্ত আছে, কালেকশনে গেছে।'

আব্দুল মজিদ বলেন, 'বৃহস্পতিবার দুপুরে আমার বোন আশরাফুলকে ফোন দিলে ফের জরেজ ফোন ধরে। কিন্তু আশরাফুলকে দেয় না। এ জন্য বোন জরেজের স্ত্রীর কাছে যান। জরেজের স্ত্রী তাকে ফোন দিলে আশরাফুল ফোন ধরে না কেন জানতে চাইলে জরেজ জানায় আশরাফুলের ফোন ড্রেনে কুড়ায় পাইছে। এরপর বোনসহ থানায় আসি। এসে শুনি তাকে খুন করা হয়েছে। তার লাশ উদ্ধার হইছে ঢাকায়। এ কথা শোনার পর আমার বোন তো অজ্ঞান হয়ে গেছে। আমরা হত্যাকারীর বিচার চাই।'

এদিকে, ঘটনার পর থেকে আত্মগোপনে রয়েছেন আশরাফুলের বন্ধু জরেজ মিয়া। তার এমন সন্দেহমূলক আচরণে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, আশরাফুলের বন্ধু কে এই জরেজ মিয়া?

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নিহত আশরাফুল হকের বাড়ি আর বন্ধু জরেজ মিয়ার (৪১) বাড়ি পাশাপাশি। গোপালপুর ইউনিয়নের গোপালপুর পশ্চিম পাড়া গ্রামের আজাদ ইসলামের ছেলে।

দুই মাস আগে মালয়েশিয়া থেকে বাড়িতে আসেন জরেজ মিয়া। এসেই জাপান যাওয়ার জন্য ৮ লাখ টাকা ধার চান বন্ধু আশরাফুলের কাছে। সেই টাকা হাতে পেতেই দু'জনে বাসে করে ঢাকায় যান। পরের দিন আশরাফুলের পরিবারের লোকজন ফোন দিলে তার ফোনটি রিসিভ করেন জরেজ মিয়া। তিনি আশরাফুলের পরিবারের লোকজনকে বলেন, আশরাফুল ফোন আমাকে দিয়ে টাকা কালেকশন করতে চট্টগ্রাম গেছে।

আরও জানা গেছে, গোপালপুর ইউনিয়নে মাদ্রাসা করার জন্য কিছু জমিও কিনেছেন জরেজ মিয়া। মাদ্রাসা তৈরি করার জন্য স্থানীয় এক ইটভাটায় ৫০ হাজার টাকাও দিয়েছেন। 

এছাড়াও, জরেজ মিয়া এলাকার বিভিন্ন মসজিদ-মাদ্রাসায় টাকা-পয়সা দিয়ে সাহায্য করেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় একটি মসজিদ কমিটির সদস্য আনোয়ার হোসেন।

এ বিষয়ে বদরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা একেএম আতিকুর রহমান দৈনিক বলেন, 'নিহত আশরাফুল হকের স্ত্রী ও স্বজনেরা থানায় এসেছিলেন। তাদের কাছ থেকে আমরা বিভিন্ন প্রকার তথ্য নিয়েছি। তথ্যগুলো রমনা থানার ওসিকে দিয়ে সহযোগিতা করছি।'

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নীল রঙের ড্রামে টুকরা টুকরা মরদেহ পাওয়া যায়। তাৎক্ষণিক মরদেহের পরিচয় শনাক্ত না হলেও পরে ফিঙ্গার প্রিন্টের মাধ্যমে পুলিশ তার পরিচয় নিশ্চিত হয়। নিহত ব্যক্তির নাম মো. আশরাফুল হক (৪২)। তার গ্রামের বাড়ি রংপুরের বদরগঞ্জের গোপালপাড়ায়। তার বাবার নাম মো. আব্দুর রশিদ ও মায়ের নাম মোছা. এছরা খাতুন।

 

পরিচয় মিলেছে ড্রামভর্তি খণ্ডিত মরদেহের

রাজধানীতে দুটি ড্রামে মিললো খণ্ডিত মরদেহ